পল্লীর নর সুন্দরদের দূর্দিন চলছে। বিলাসবহুল সেলুনের কারণে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে না পেরে অনেকেই তাদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ছুটছে। এক সময়ে গ্রাম এলাকার নর সুন্দরদের বেশ কদর ছিল। হাতে গোনা দু একজন বাদে গ্রামের প্রায় লোকজনই সৌন্দয্য বৃদ্ধির জন্য নরসুন্দরদের উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন গ্রাম্য নরসুন্দরদের ছেড়ে সেলুনের দিকে ঝুঁকেছে মানুষ। ফলে গ্রামাঞ্চলে টুল পেতে বসে চুল কাটা নাপিতদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে । পেশা ছেড়েছে অনেকে।

জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে যারা চুল কাটেন এদেরকে আঞ্চলিক নাম নাপিত। অনেকেই আবার এদের ডাকেন প্রামাণিক বলে। আগের দিনে দোকান বা বাজার নয় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নাপিতেরা চুল কাটতো। নাপিত বাড়িতে আসার কথা শুনলেই বড় ছোট সকলেই নাপিতের কাছে ভীড় জমাতো। বাড়ির কোনে গাছের ধারে নাপিত একটি টুল পেতে আসন বসাতেন। নাপিত মাজায় গামছা বেঁধে তৈরি হতেন। কে আগে আর কে পরে চুল কাটবে তা নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। ছোট বড় সকলেই চুল কাটার জন্য টুলের উপর বসলে নাপিত মাধারি ধরনের একটি কাপড় গায়ের উপর দিয়ে গলার নিচে বেঁধে দিতেন। নাপিত চুলের উপর হাত বুলিয়ে চিরুনী লাগিয়ে কাঁচি দিয়ে চুল কাটা শুরু করতেন। কেঁচির ক্যেঁচ কু্যঁচ আওয়াজের সাথে নাপিতেরা গান ধরতেন।

গানের তালে তালে হাত চালাতেন নরসুন্দরেরা। ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা চুল কাটতেন এক রকম করে। যুবকেরা কাটতেন হরেক রকমের ডিজাইনের কথা বলে। বুড়োরা মাথায় সমান করে ছোট ছোট করে চুল কাটাতেন। নাপিত চুল কাটতে কাটতে মাঝে মধ্যে কাঁচি চিরুনীর সাথে বাড়ি দিতেন। সেই সঙ্গে চুল সমান করার জন্য পুরাতন ইমেজের একটি বড় ক্ষুর রাখতেন। ক্ষুর চামড়ার বেল্টের সাথে ঘষে ধার তুলতেন এবং কানের কলিসহ মাথার চুলের চারিধারে সমান করে পরিস্কার করতেন।

চুল কাটার সাথে বয়ষ্করা আবার অনেই দাড়ি কামাতেন। দাড়ি কামানোর জন্য নাপিত মুখে সাবান ঘষে দিতেন এবং বেশ কিছু সময় মুখে মালিশ করার পর ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কাটার কাজ করতেন। কাজ শেষে নাপিতেরা টাকা পয়সা নিতেন না। যে যা পারে বখশিষ দিতো তা দিয়েই নাপিতেরা বিদায় নিতো। মাসের প্রায় শেষের দিকে নাপিতেরা গ্রামের সকল বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এভাবেই চুল কাটতো। বছর ঘুরে ধানের মৌসুম এলে গ্রামের নরসুন্দরেরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ধর্না দিতো। প্রতি বাড়ি হতে ধান চাল আদায় করতো। এভাবেই তারা রোজগার করতো এবং চালাতো তাদের সংসার।

এখন আর আগের মতো নেই। আগের মতো মানুষ আর গ্রামের নরসুন্দরদের কাছে টুলে বসে চুল কাটেনা। গ্রামের প্রামাণিকদেরও আর কেউ বাড়িতে ডাকেনা। আধুনিকতার ছোয়ায় সবকিছুতে পরিবর্তন এসেছে। এ ছোয়া লেগেছে প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলেও। গ্রামের মোড়ে মোড়ে, হাট বাজারে, শহরে স্থাপিত হয়েছে অনেক উন্নত মানের সেলুন। সেসব সেলুনে বসেই লোকজন চুল কাটায়। গ্রামের লোকেরা এখন উন্নত রেজারে ভালো মানের ফোম দিয়ে বাড়িতে বসেই সেভ করে। গ্রামের মানুষও সেলুনমুখী হওয়ায় পল্লীর নরসুন্দরদের কাছে আর কেউ কাজ করতে চায়না। বয়স্ক দু’একজন গ্রামের নাপিতের কাছে কাজ করলেও তা দিয়ে তাদের সংসার চলেনা। ফলে গ্রামের নরসুন্দর, নাপিত বা প্রামাণিকের এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে বাপ দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খোর্দ আইলচারা গ্রামের কার্ত্তিক প্রমাণিক জানান, দীর্ঘদিন বাপ দাদার পেশা আঁকড়ে ছিলাম। এখন আর আমাদের কাছে কেউ চুল কাটেনা। তাই এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। এভাবেই প্রসাধনী সেলুনের কারণে গ্রামাঞ্চলে নাপিতেরা পেশা ছাড়ছে।