যশোর সদর উপজেলার ভগবতীতলা। শান্ত-স্নিগ্ধ এই গ্রামটি অন্য অনেক গ্রামের মতোই। তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যতিক্রমী সামাজিক রীতি ও লোকবিশ্বাসের কারণে এলাকাজুড়ে এর রয়েছে আলাদা পরিচিতি। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই শতাধিক বছর ধরে এ গ্রামে গরুর দুধ বিক্রি করা হয় না। এমনকি গরু বিক্রি বা গরুর গোশত বিক্রির সঙ্গেও নানা সামাজিক বিধিনিষেধ জড়িয়ে রয়েছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতির পেছনে রয়েছে নানা গল্প, জনশ্রুতি ও লোকবিশ্বাস। তবে এর সত্যতা কতটুকু? আদৌ কি কোনো অমঙ্গল ঘটেছে, নাকি এটি নিছকই একটি লোকবিশ্বাস—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয়েছে স্থানীয় প্রবীণ, শিক্ষক, ইমাম ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভগবতীতলার এই রীতির বয়স দুই শতাধিক বছর বলে প্রচলিত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত ঐতিহাসিক দলিল বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ স্থানীয়দের কাছে পাওয়া যায়নি। মুখে মুখে প্রচলিত একটি কাহিনিই মূলত এই রীতির ভিত্তি।

স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছর আগে এক সাধু-সন্ন্যাসী আশপাশের কয়েকটি গ্রামে দুধ চেয়ে পাননি। তবে ভগবতীতলার কয়েকজন মানুষ তাঁকে দুধ দেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে ওই সাধু গ্রামবাসীর প্রশংসা করেন এবং গ্রামের নাম ‘ভাগ্যবতীতলা’ রাখেন—এমন কথা স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত। পরবর্তী সময়ে সেই নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘ভগবতীতলা’ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

তবে এই কাহিনির পক্ষে কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে এটি ইতিহাসের নিশ্চিত ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি লোককথা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

গ্রামের প্রচলিত রীতির বাস্তব প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে স্থানীয়রা সদর আলী ও আবু বক্করের কথা বলেন। প্রচলিত রীতি ভাঙতে তাঁরা একসময় গরু বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের বিশ্বাসের কারণে তাঁদের কাছ থেকে গরু কিনে জবাই করে গোশত বিক্রি করতে ক্রেতাদের অনীহা ছিল। ফলে ব্যবসায় লোকসানের মুখে পড়েন তাঁরা। একপর্যায়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তৈরি হয়েছে নানা ব্যাখ্যা। গ্রামের এক শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস, গরু বিক্রি ও গোশতের ব্যবসা করার কারণেই তাঁরা গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে স্থানীয়দের বক্তব্যেই উঠে এসেছে, ব্যবসায়িক লোকসানই তাঁদের স্থানান্তরের বাস্তব কারণ হতে পারে। অর্থাৎ ঘটনাটি সত্য হলেও এর সঙ্গে অলৌকিক অমঙ্গল বা শাস্তির সম্পর্কের কোনো প্রমাণ নেই।

ভগবতীতলার প্রবীণ মিষ্টি ব্যবসায়ী ফজর আলী প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে মিষ্টির ব্যবসা করছেন। দীর্ঘ এই ব্যবসায়িক জীবনে তিনি নিজে কখনো দুধের মিষ্টি তৈরি করেননি। পাশের রূপদিয়া বাজার থেকে মিষ্টি কিনে এনে নিজের দোকানে বিক্রি করেন তিনি।

স্থানীয়দের মতে, গ্রামের প্রচলিত সামাজিক রীতি ও মানুষের বিশ্বাসের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মিষ্টির ব্যবসা চলে আসছে। তবে দুধের মিষ্টি তৈরি বা বিক্রি করলে কারও কোনো ক্ষতি হয়েছে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনা তাঁর জানা নেই।

ভগবতীতলা হাফিজিয়া মাদরাসার হাফেজ এবং ভগবতীতলা পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম আবু রায়হান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অপসংস্কৃতি। আমরা যেসব কথা শুনে আসছি, তার কোনো ভিত্তি নেই। কেউ দুধ বিক্রি করেছে কিংবা গরু বিক্রি করেছে—এ কারণে কেউ মারা গেছে বা কারও ক্ষতি হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।’

তিনি আরও বলেন, মুরব্বিদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, বহু বছর আগে একজন ব্যক্তি দুধ চেয়ে ভগবতীতলার মানুষের কাছ থেকে দুধ পেয়েছিলেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি গ্রামের নাম ‘ভাগ্যবতীতলা’ দিয়েছিলেন বলে প্রচার রয়েছে।

ইমাম আবু রায়হান বলেন, ‘বর্তমানে যে রীতি-নীতি চলে আসছে, ইসলামে তার কোনো ভিত্তি নেই। এটিকে ধর্মীয় বিধান মনে করার সুযোগ নেই। এ ধরনের বিশ্বাস কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়।’

ভগবতীতলার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন, এ গ্রামে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি রীতি চলে আসছে। গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটি পালন করে আসছেন। তবে এর প্রকৃত ইতিহাস কী কিংবা রীতি না মানলে সত্যিই কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলার মতো কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।

ভগবতীতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হাসানও এ ধরনের বিশ্বাসকে ভিত্তিহীন বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এই গ্রামেরই মানুষ। পুরোনো আমল থেকে একটি রীতি চলে আসছে—এ কথা শুনেছি। কিন্তু কেউ দুধ বিক্রি করেছে কিংবা গরু বিক্রি করেছে বলে তার কোনো ক্ষতি হয়েছে—এমন ঘটনা আমি কখনো শুনিনি।’

তাঁর মতে, কোনো স্বাভাবিক ঘটনা, রোগ, মৃত্যু কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতিকে কোনো একটি সামাজিক রীতি ভঙ্গের ফল হিসেবে বিবেচনা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ভগবতীতলার ২০০ বছরের কথিত ইতিহাস নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় লোকঐতিহ্য। একটি জনপদের মানুষের মুখে মুখে কোনো ঘটনা শত বছর ধরে টিকে থাকা নিজেই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লোককথা আর প্রামাণ্য ইতিহাস এক বিষয় নয়।

দুধ বিক্রি, গরু বিক্রি কিংবা গরুর গোশত বিক্রির সঙ্গে কারও মৃত্যু, অমঙ্গল বা বিপদের সম্পর্ক রয়েছে—এমন ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকলে তা সমাজে প্রচার করা উচিত নয়। স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক ও সচেতন মানুষের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই কথা—ভগবতীতলার এই প্রচলিত রীতি ধর্মীয় কোনো বিধান নয়; বরং এর সঙ্গে কুসংস্কারের উপাদান রয়েছে।