স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা এখন স্পষ্টভাবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আমিনুল ইসলামের যোগদানের প্রথম দিনেই বিক্ষোভ, বাধা, বহিরাগত উপস্থিতি এবং পাল্টাপাল্টি অবস্থান প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের আলোকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে সোমবার দুপুরে ব্রি ক্যাম্পাসে পৌঁছালে ড. আমিনুল ইসলামকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্র জানায়, বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের নেতৃত্বে কিছু কর্মচারী, শ্রমিক এবং বহিরাগত ব্যক্তি প্রধান ফটক ও ডিজি দপ্তরের সামনে অবস্থান নেন এবং নতুন মহাপরিচালকের প্রবেশে আপত্তি জানান। এ সময় স্লোগান ও প্রতিবাদের মাধ্যমে তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অন্যদিকে ড. আমিনুল ইসলামের সমর্থনে বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশ তাঁকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে ব্রিতে দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও স্থানীয় পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে ড. আমিনুল ইসলামকে তাঁর কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং বিকেলে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকার তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করবেন এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বাধা কাম্য নয়। তাঁর এই বক্তব্যকে অনেকেই প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, বিজ্ঞানী সমিতির একটি অংশ নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালককে নিয়ে নীতিগত আপত্তির কথা জানিয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট মহলকে ভুল তথ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই আপত্তির পেছনে শুধুমাত্র নীতিগত প্রশ্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও স্বার্থসংঘাতও ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্রির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় সুবিধাপ্রাপ্ত একটি অংশ বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে অপপ্রচার, কর্মসূচি এবং বহিরাগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন মহাপরিচালক পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, নতুন নিয়োগ সেই অচলাবস্থা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যে গবেষণা প্রকল্প, আর্থিক অনুমোদন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গতি ফেরার প্রত্যাশা করছেন প্রতিষ্ঠানটির একটি বড় অংশের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তা।
এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সব পক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
প্রসঙ্গত, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড. আমিনুল ইসলামকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্রির মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞ এই বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও গবেষণার ধারাবাহিকতা ফিরে আসবে-এমন প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।