জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে শনাক্ত হওয়ার পরও চাকরিতে বহাল রয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) মোঃ আলতাফ হোসেন। একই সঙ্গে তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার ইনডেক্স নম্বর ২৭৪৬০৬। এ ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-তদন্ত প্রতিবেদনে সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পরও ব্যবস্থা কোথায়?

সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা যায়, আলতাফ হোসেনের ব্যবহৃত সনদ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অধীন জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার) কর্তৃক তদন্তের পর সনদটি জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্মারক নম্বর ৩৭.১৯.০০০০.০০৭.১৬.০০৪.২৫.৫, তারিখ ১৯ জানুয়ারি ২০২৫। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে মোঃ আলতাফ হোসেন, ইনডেক্স নম্বর ২৭৪৬০৬ এবং শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৬৩ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কীভাবে চাকরিতে বহাল রয়েছেন-এ প্রশ্নই এখন সামনে। প্রতিবেদনের পর তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, বেতন-ভাতা বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে কি না এবং উল্লেখিত অর্থ আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে-এসবেরও স্পষ্ট উত্তর মিলছে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

অভিযুক্ত শিক্ষক আলতাফ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অভিযুক্ত শিক্ষকের চাকরি ও বেতন-ভাতার বিষয়ে শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুল হাসান মন্ডল-এর সঙ্গে কথা বলে দৈনিক সংগ্রাম। তিনি বলেন, “আমি ওয়েবসাইট থেকে জেনেছি, লিখিতভাবে কোনো কিছু পাইনি। ডিজি স্যারের বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো আদেশ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের পর প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে-সরকারি ওয়েবসাইটে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়নি কেন? আর কোনো নির্দেশনা না থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সনদ নিয়ে ওঠা গুরুতর প্রশ্নের প্রশাসনিক নিষ্পত্তি করবে কে?

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি নাহিদ ভূইয়া দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, “আমি এ বিষয়ে অবগত নই। জেনে বিষয়টি দেখব।” একটি সরকারি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সনদ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরও গভর্নিং বডির সভাপতি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকায় প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শ্রীপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, “নট্রামস ১৯৯৬ সাল থেকে সার্টিফিকেট বিতরণ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে তারা বলেছে, তাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে, তারা বিতরণ করতে পারবে। সার্টিফিকেট বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সিদ্ধান্ত নেবে কর্তৃপক্ষ”

গাজীপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মানুন দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, “মাধ্যমিক পর্যায়ের বয়েজ, গার্লস এবং মাদ্রাসার অভিযুক্ত শিক্ষকদের সার্টিফিকেট তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সিদ্ধান্ত উপর মহলের ।”

এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “যে শিক্ষকের সনদ নিয়ে তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে, তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সুশিক্ষার শিক্ষা দেবেন? বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার হওয়া দরকার।”

তদন্ত প্রতিবেদনে ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৬৩ টাকা আদায়যোগ্য উল্লেখ থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থ কেন আদায়যোগ্য, আদায়ের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এবং চাকরির মেয়াদে সরকারি কোষাগার থেকে ওই শিক্ষকের বেতন-ভাতা বাবদ কত টাকা দেওয়া হয়েছে-এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

কারণ, বিষয়টি শুধু একজন শিক্ষকের সনদের বৈধতা নিয়ে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। তদন্তে যদি সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার তথ্য সরকারি নথিতে থাকে, তাহলে সেই নথির পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণ কী-এ প্রশ্নের উত্তরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসা প্রয়োজন।

এখন সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-তদন্ত প্রতিবেদনের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? অভিযুক্ত শিক্ষক কোন প্রশাসনিক অবস্থায় রয়েছেন? বেতন-ভাতা চলমান থাকলে তার অনুমোদন কে দিচ্ছেন? প্রতিবেদনে উল্লেখিত ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৬৩ টাকা আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা।