কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী তিলের খাজা ব্রিটিশ আমল থেকে কুষ্টিয়া শহর ও এর আশপাশের এলাকার কারখানাগুলোতে তৈরি হয়ে আসছে।
শহরের মিলপাড়া ও জয়নাবাদ এলাকায় তৈরি হয়ে আসছে। চিনি ও তিল দিয়ে তৈরি এই সুস্বাদু মিষ্টান্নটি দেশের গন্ডি পেরিয়ে দেশ বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি স্বীকৃত জিআই পণ্য হিসাবে স্থান লাভ করেছে। জেলার উৎপাদিত তিলের উপর নির্ভর করে কুষ্টিয়ায় গড়ে উঠেছে দেশের বিখ্যাত তিলের খাজা কারখানা। এখানকার কারখানায় তৈরি তিলের খাজা জেলা ছাড়াও দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে।
কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালী উপজেলাতে এ পেশার সাথে জড়িত কয়েকশ’ পরিবার। হাতে তৈরি খেতে দারুণ সুস্বাদু কুষ্টিয়ার এ তিলের খাজা দুইশ’ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। খাবারটি কুষ্টিয়ার নামের সাথেই মিশে আছে। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে নানা রকম হাঁকডাকের মাধ্যমে রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন ও লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হতে দেখা যায় কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা।
জানা যায়, মচমচে সুস্বাদু কুষ্টিয়ার তিলের খাজা সারা দেশব্যাপী ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। কুষ্টিয়ার মুখরোচক এই তিলের খাজা এখন পরিণত হয়েছে ক্ষুদ্র শিল্পে। অখন্ড ভারতীয় উপমহাদেশের সময়কালেই তিলের খাজার প্রচলন ঘটে কুষ্টিয়ায়। ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার আগে শহরের মিলপাড়ায় ও দেশওয়ালী পাড়ার পাল সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি পরিবার তিলের খাজা তৈরি শুরু করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আবদুল মজিদ, চাঁদ আলী, সাইদুল ইসলাম, ইদিয়ামিন, সরওয়ারসহ আরো কয়েকজন মিলে কারখানায় তিলের খাজা তৈরির ব্যবসা করে এ শিল্পের দুই শ’ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তবে পরে কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নে লালন শাহের মাজারের আশপাশেও বেশ কয়েকটি তিলের খাজার কারখানা গড়ে উঠেছে।
সারা বছরই তৈরি করা হয় তিলের খাজা। তবে শীত মৌসুমে এর আলাদা কদর রয়েছে। এপ্রিল- জুলাই মাস পর্যন্ত চলে তিলের খাজা মৌসুম। কুষ্টিয়ার হাজারও ঐতিহ্যের মধ্যে একটি তিলের খাজা। কুষ্টিয়ার তিলের খাজার নাম শুনলে জিভে পানি আসে না এমন লোকের সংখ্যা কমই আছে। এক সময় শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তিলের খাজা তৈরি করা হতো। কালের আবর্তে এর কদর বেড়েছে দেশজুড়ে। এটি এখন পরিণত হয়েছে একটি খাদ্য শিল্পে।
এ জেলার উৎপাদিত তিলের উপর ভিত্তি করেই নদীয়াতে বৃটিশ আমলে গড়ে ওঠে কয়েকটি তিলের খাজার কারখানা। সে সময় থেকেই তিলের খাজার চাহিদার কারণে কুষ্টিয়ায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু তিলে খাজার ফ্যাক্টরী। এখানকার তৈরি তিলে খাজা জেলা ছাড়াও সারা দেশে পাঠানো হচ্ছে। সুনাম অর্জন করেছে এ জেলার তৈরি তিলের খাজা। এ কারখানার সাথে জড়িতও রয়েছে কয়েক’শ শ্রমিক।
এ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে বাড়তি লোকের কর্মসংস্থান। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি করা হলে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সে সুবিধা না থাকার কারণে সম্ভাবনা সত্ত্বেও প্রসার ঘটছে না এই ক্ষুদ্র শিল্পের। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনটন আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে এ শিল্প।
এখন মিলপাড়াতে বিখ্যাত ‘ভাই ভাই তিলের খাজা’ নামের একটিই মাত্র কারখানা রয়েছে। এ কারখানার বয়স আনুমানিক ৪৬ বছর। সব মৌসুমেই রাতে তৈরি হয় তিলের খাজা, আর দিনে রাতে সব সময় বিক্রি হয়।
ছেঁউড়িয়ার আবদুল মজিদ কুষ্টিয়ার তিলের খাজা কারখানা পরিচালনায় সবচেয়ে প্রবীণ কারিগর। প্রায় ৪৫ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করছেন। ‘১নম্বর নিউ স্পেশাল ভাই ভাই তিলের খাজা’ কারখানায় আছেন অর্ধশতাধিক শ্রমিক-মালিক।
আবদুল মজিদ বলেন, ‘এ ব্যবসাটি কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যের অংশ। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে আসেন এখানকার তিলে খাজার কারখানায়। তারা বিভিন্ন তথ্য নেন। একে এখন শিল্পের মর্যাদায় আনতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সার্বিক সহায়তা দিয়ে এ শিল্পকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে।’
তিলের খাজা তৈরির প্রধান উপকরণ তিল ও চিনি। চুলায় চাপানো বড় লোহার কড়াইয়ের মধ্যে চিনি দিয়ে গণগণে আগুনে জাল দিয়ে তৈরি হয় সিরা। নির্দিষ্ট তাকে আসার পর নামানো হয় চুলা থেকে। হালকা ঠান্ডা হলে চিনির সিরা জমাট বেধে যায়, তখন শিংয়ের মত দো-ডালা গাছের সাথে হাতে টানা হয় জমাট বাধা চিনির সিরা। এক পর্যায়ে বাদামি থেকে সাদা রঙে পরিণত হলে কারিগর বিশেষ কায়দায় হাতের ভাঁজে ভাঁজে টানতে থাকে। তখন এর ভেতরে ফাঁপা আকৃতির হয়। সিরা টানা শেষ হলে রাখা হয় পরিস্কার স্থানে। নির্দিষ্ট মাপে কেটে তাতে মেশানো হয় খোসা ছাড়ানো তিল। এভাবেই তৈরি হয়ে গেল তিলের খাজা। পরে এগুলো প্যাকেটজাত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
এই ব্যবসার জন্য যথেষ্ট পুঁজির প্রয়োজন হয়। ব্যবসা আরও প্রসার হলে এ পেশার সঙ্গে নিয়োজিত কয়েক হাজার মানষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো। কুষ্টিয়ার তিলের খাজা তৈরি ও বিক্রয়ের সঙ্গে নির্ভর করছে কুষ্টিয়ার ও বাইরের জেলার কয়েক হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা। এ শিল্পটিকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সাধারণ তিলের খাজা ১৮০ ও স্পেশাল তিলের খাজা ২২০ টাকা কেজি এবং এর এক প্যাকেট ২০ টাকায় বিক্রি হয়। দামে কম বলে এটি গ্রামগঞ্জেও খুব জনপ্রিয়। এটা বিক্রি করে বহু হকার জীবিকা নির্বাহ করেন। কুষ্টিয়া ছাড়াও ঢাকা ও দেশের কয়েকটি জেলায় তিলের খাজা তৈরির কারখানা আছে। তবে অন্য জেলায় তৈরি হলেও অনেকেই এটি কুষ্টিয়ার নাম দিয়ে বাজারে ছাড়েন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে তিলের আবাদ হয়েছে। প্রতি বছর তিলের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বছর জেলায় আবাদকৃত তিলের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে চাষীরা জানায়।
কুষ্টিয়ায় বিনাতিল-১সহ ২ জাতের তিল আবাদ হচ্ছে। খাজা কারখানায় বিনা তিলের চাহিদায় বেশি। তিলের খাজা তৈরি করতে উন্নত তিল, চিনি, দুধের প্রয়োজন হয়।
কুষ্টিয়ায় ৪৬ বছর আগে দুটি কারখানায় তিলের খাজা তৈরি হতো। দিনের পর দিন এর চাহিদা বেশি হওয়ায় কারখানা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েক,শ বেকার শ্রমিক এসব কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিলের খাজা মালিকরা এগুলো দেশের বাইরেও রপ্তানী করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিলের খাজার কারখানা মালিক আব্দুল মজিদ জানায়, আমাদের কারখানায় উৎপাদিত তিলের খাজা জেলা ছাড়াও বাইরে পাঠিয়ে থাকি। এ ব্যাপারে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা এ ব্যবসাকে আরো প্রসারিত করতে পারবো।
কুষ্টিয়া জেলায় উৎপাদিত তিলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে দেশের বিখ্যাত তিলের খাজা কারখানা। এসব কারখানায় কয়েক,শ শ্রমিক কাজ করছে। কুষ্টিয়ায় উৎপাদিত তিলের খাজা জেলার চাহিদা পূরণ করে প্রতিদিন বাইরে পাঠানো হয়। খাজার চাহিদা বেশি হওয়ায় এ ব্যবসার প্রসারও ঘটছে। তবে খাজার কারখানা মালিকদের সহযোগিতা করলে এ জেলার উৎপাদিত তিলের খাজা বাইরেও পাঠানো যাবে বলে কারখানার মালিকরা অভিমত প্রকাশ করেন।