বর্ষার পানিতে সিক্ত মাঠ। কোথাও সদ্য চাষ করা জমি, কোথাও আবার সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে সবুজ ধানের চারা। সকাল হলেই কাদা-পানিতে নেমে পড়ছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। কারও হাতে ধানের চারা, কেউ ব্যস্ত জমি সমতল করতে, আবার কেউ সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন। এমন কর্মচঞ্চল দৃশ্য এখন নাটোরের বিভিন্ন উপজেলার মাঠে। চারদিকে চলছে রোপা আমন ধানের চারা রোপণের ব্যস্ততা।

চলতি মৌসুমে নাটোর জেলায় ৭৬ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিতেও দ্রুতগতিতে চলছে রোপণ কার্যক্রম। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

জেলার সদর উপজেলার ভেদ্রার বিলের জাঠিয়ান, জয়নগর, পাইকেরদোল, নলডাঙ্গা উপজেলার সেনবাগ, বাঁশিল দক্ষিণপাড়া, বাসুদেবসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন চাষকে ঘিরে কৃষকদের মধ্যে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জমিতে চারা রোপণ করছেন। কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে চারা লাগাচ্ছেন। জমির আইলজুড়ে দেখা যাচ্ছে সবুজ আমনের চারা। সবুজ চারায় বদলে যাচ্ছে মাঠের চিত্র।

বাঁশিল দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমন ধান এলাকার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বর্ষার পানি পাওয়ায় এবার জমি প্রস্তুত করা ও চারা রোপণে সুবিধা হচ্ছে। সময়মতো চারা রোপণ করতে পারলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছি।”

সদর উপজেলার তরুণ কৃষক জুবায়ের হোসেন বলেন, “ভরা বর্ষাতেও এবার বিলে পানি না থাকায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এভাবে বৃষ্টিধারা অব্যাহত থাকলে ধানের ফলন ভালো হবে। আর ধানের ফলন ভালো হলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হবে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়াটাও জরুরি।”

সেনবাগ এলাকার কৃষক মো. আতাউর রহমান বলেন, “আমনের চারা রোপণের জন্য এখন উপযুক্ত সময়। জমিতে পানি ও প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকায় চারা রোপণে সুবিধা হচ্ছে। তবে শ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ ও জমি প্রস্তুতির খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। খরচ যতই হোক, কৃষক চাষাবাদ করবেই। ধান আমাদের প্রধান ফসল। এবার রোগবালাই কম থাকলে এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।”

বাসুদেব এলাকার কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, “আমনের চারা রোপণের কাজ এখন পুরোদমে চলছে। জমি প্রস্তুত করে সময়মতো চারা লাগানো হচ্ছে। কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত জাতের ধান চাষ করছি। ভালো ফলনের পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য পেলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন।”

উন্নত জাতের ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯১, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪, ব্রি ধান-১০৩, বিনা ধান-২০, বিনা ধান-২২, বিনা ধান-২৬, বিনা-৭ ও স্বর্ণা-৫ জাতের ধান চাষ করছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চারা রোপণের সময় উপযুক্ত বয়সের চারা নির্বাচন, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। জেলায় রোপা আমন চাষের কার্যক্রম ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ হয়েছে। কৃষকরা যাতে সময়মতো চারা রোপণ করতে পারেন, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আশাবাদী কৃষি বিভাগ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, “চলতি মৌসুমে জেলায় ৭৬ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। রোপণ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।”

তিনি বলেন, “এবার কৃষকরা আমন চাষে অত্যন্ত আগ্রহী। আবহাওয়া ও মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি কৃষির জন্য মোটামুটি অনুকূলে রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।”

তিনি আরও বলেন, ভালো ফলনের জন্য চারা রোপণের পর থেকেই জমির নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, প্রয়োজনীয় পানি ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাইয়ের বিষয়ে কৃষকদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কৃষকের চোখে নতুন স্বপ্ন

আমন ধানকে ঘিরে শুধু মাঠেই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মচাঞ্চল্য। চারা রোপণ থেকে শুরু করে আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই কাজের সুযোগ তৈরি হয় কৃষি শ্রমিকদের।

কৃষকের কাছে একটি ভালো আমন মৌসুম মানে শুধু গোলাভরা ধান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের খরচ মেটানো, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী ফসলের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার স্বপ্ন।

তাই কাদা-পানিতে দাঁড়িয়ে ধানের চারা রোপণ করতে করতে কৃষকের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন—আজকের এই সবুজ চারা একদিন সোনালি ধানে ভরে উঠবে মাঠ। সেই ধানের ফলনে ঘরে ফিরবে স্বস্তি, আর কৃষকের মুখে ফুটবে হাসি।