রাজধানীর যানজট ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আরও ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরাযুক্ত ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হচ্ছে।

এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি মোড় রয়েছে।

গেল কয়েক মাস ধরে রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়কে সিগন্যাল বাতি মেনে যানবাহন চলাচল এবং পথচারীদের সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তা পারাপারের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার ১৩টি পয়েন্টে সেমি-অটোমেটেড ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এসব সিগনালের কয়েকটিতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরা সংযোজন করা হয়েছিল।

এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের আরও ৫০টি ইন্টারসেকশন। নতুন এসব সিগন্যাল পরিচালনার জন্য নতুন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ‘ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটির ২৮ মোড়

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন, মোহাম্মদপুর থানা, কলেজ গেট, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, মিরপুর-১, সনি সিনেমা হল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মিরপুর-৬, মিরপুর-১৪, আগারগাঁও, আবহাওয়া অধিদপ্তর, পরিকল্পনা কমিশন, গুলশান ক্লাব, গুলশান আজাদ মসজিদ, গুলশান-১, গুলশানের ডোমিনোজ ক্রসিং, পুলিশ প্লাজা, নিকেতন, তেজগাঁওয়ের পুরোনো আড়ং, শান্তা টাওয়ার, তেজগাঁও-মহাখালী লিংক রোড, বিওয়াইডি শোরুম, রেইনবো ক্রসিং এবং হাতিরঝিল-মগবাজার ক্রসিং।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২২ মোড়

আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি-৬, ধানমন্ডি-৭, কলাবাগান, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি-২৭, কাঁটাবন, বাটা সিগন্যাল, কাকরাইল, বিজয়নগর, ফকিরেরপুল, দৈনিক বাংলা মোড়, বঙ্গভবন, গুলিস্তান স্কয়ার, জিপিও, পল্টন মোড়, গ্রিন রোড, মগবাজার মোড়, মিন্টো রোড এবং অফিসার্স ক্লাব ক্রসিং।

নতুন এই ব্যবস্থা চালুর ফলে চালকদের মধ্যেও ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে। চালকদের কেউ কেউ বলছেন, সিগন্যাল অমান্য করলে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে মামলা হতে পারে-এমন একটি ভয় কাজ করছে। ফলে তারা আগের তুলনায় আরও সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন।

একজন চালক বলেন, এখন একটা ভয় কাজ করে যে গেলে হয়তো এআইর মামলা হয়ে যেতে পারে। সতর্ক থাকার জন্য বর্তমানে এই সিস্টেমটা দরকার আছে। এটা সরকারের খুব ভালো একটি উদ্যোগ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বর্তমানে যে ব্যবস্থা বসানো হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ অটোমেটেড। এটি পরিচালনার জন্য আলাদা অপারেটরের প্রয়োজন হবে না। সিস্টেমটি ডিমান্ড রেসপন্সিভ। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ চাইলে হাতের ট্যাবের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সিগন্যাল পরিবর্তন করতে পারবেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভ্যাস থেকে মানুষকে বের করে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে এআই সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘একটা প্রিকনসিভ আইডিয়া থেকে লোকজনকে বের করে নিয়ে এসে একটা ডিসিপ্লিনের পর্যায়ে পৌঁছানো, এটা কিন্তু রাতারাতি সম্ভব না। আমরা একটা ব্যাপারে সন্তুষ্ট, সাধারণ লোকজন এটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে। এটির বিপক্ষে কেউ নেই।

তবে এআই ক্যামেরাযুক্ত সিগন্যালিং নিয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা মিশ্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আধুনিক প্রযুক্তির সিগন্যাল বসালেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। সড়কে ফিটনেসবিহীন ও নিয়মবহির্ভূত যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যত্রতত্র পথচারী পারাপার ও ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ট্রাফিক সার্জেন্ট তারিকুল বলেন, ‘যেখানে যত্রতত্র মানুষের পারাপার কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে, সেখানে ওই এআই সিগন্যাল সিস্টেমটা সেভাবে কাজ করতে পারতেছে না।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে করা গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যানজট কমাতে নতুন এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।