একটি গুলি। মুহূর্তেই বদলে গেল ৬৫ বছরের হেলাল উদ্দিনের পুরো জীবন। যে পা দিয়ে বছরের পর বছর কাঁঠালের ব্যবসার জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন, জীবিকার প্রয়োজনে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পাড়ি জমিয়েছেন—সেই বাম পা এখন আর নেই। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পা হারিয়ে আজ তিনি পঙ্গু। অর্থাভাবে চিকিৎসা ও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
হেলাল উদ্দিন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের সোহাদিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে কাঁঠালের ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় ১১টা। ট্রাকে কাঁঠাল নিয়ে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন হেলাল উদ্দিন। পরদিন একটি মেলায় কাঁঠাল তুলতে হবে। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই ওই দিন জৈনাবাজার এলাকা থেকে রওনা হন তিনি।
কিন্তু রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছানোর পরই হঠাৎ শুরু হয় গুলাগুলি। চারদিকে আতঙ্ক। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে আসে একটি গুলি। সেই গুলিই বিদ্ধ করে হেলাল উদ্দিনের বাম পা।
গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান তিনি। পরে ট্রাকচালক তাঁকে দ্রুত যাত্রাবাড়ীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি তাঁর বাম পা। কেটে ফেলতে হয় শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
দৈনিক সংগ্রামকে হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি ব্যবসার কাজে কাঁঠাল নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছিলাম। পরদিন মেলায় কাঁঠাল তুলতে হবে। তাই রাত ১১টার সময় হলেও রওনা হয়েছিলাম। তখন কি জানতাম, এই যাত্রাই আমার জীবনের শেষ স্বাভাবিক যাত্রা হবে!”
দৈনিক সংগ্রামকে তিনি বলেন, “যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছানোর পর হঠাৎ গুলাগুলি শুরু হয়। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি এসে আমার বাম পায়ে লাগে। প্রচণ্ড ব্যথায় আমি মাটিতে পড়ে যাই। সেই মুহূর্তের কথা মনে হলে এখনো বুক কেঁপে ওঠে।”
দৈনিক সংগ্রামকে হেলাল উদ্দিন বলেন, “ট্রাকের ড্রাইভার আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। অনেক চেষ্টা করেও আমার পা রক্ষা করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত আমার বাম পা কেটে ফেলতে হয়েছে। চোখের সামনে নিজের পা হারানোর সেই কষ্ট আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
একটি পা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবসা। যে মানুষটি নিজের শ্রমে সংসার চালাতেন, এখন তাঁকেই অন্যের সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় পরিবারটিও পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে।
দৈনিক সংগ্রামকে হেলাল উদ্দিন বলেন, “চিকিৎসা করাতে গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। একসময় নিজের উপার্জনে চলতাম, এখন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমার কাছে এখন কোনো টাকা-পয়সা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “একটি পা হারানোর পর মনে হয়, আমি যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। আগে নিজের হাতে কাজ করেছি, ব্যবসা করেছি, সংসারের জন্য ছুটে বেড়িয়েছি। এখন একটু চলাফেরা করতেও অন্যের সহযোগিতা লাগে। চিকিৎসার খরচ কীভাবে চালাব, সংসার কীভাবে চলবে—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে দৈনিক সংগ্রামকে হেলাল উদ্দিন বলেন, “একটি গুলি শুধু আমার পা নেয়নি, আমার জীবনটাই থামিয়ে দিয়েছে। আমি এখন কীভাবে সংসার চালাব, কীভাবে চিকিৎসা করাব—কিছুই বুঝতে পারছি না। যারা মানুষের কষ্ট বোঝেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার পাশে দাঁড়ান।”