আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে তিন মুসলিম দেশ নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসন ঠেকাতে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করাই এ চুক্তির মূল লক্ষ্য। তবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তির আওতায় তিন দেশ ঠিক কী ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। আল জাজিরা, রয়র্টাস।

তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও চাইলে এতে যোগ দিতে পারবে। একই সঙ্গে এটি তিন দেশের বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি বাতিল বা প্রতিস্থাপন করবে না। তবে তিন দেশই ইসরাইল ও শিয়া-শাসিত ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সময়ে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।

এনিয়ে গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, এই সম্মেলনের রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ভাষায়, মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি দেশ এমন এক সময়ে একত্রিত হয়েছে, যখন আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা তীব্র। এটি নিরাপত্তার বিষয়ে আঞ্চলিক ও মধ্যম শক্তিগুলোর আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামো যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং বাস্তব সহযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আরও আঞ্চলিক নেতৃত্বনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। বর্তমানে তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর একটি, ইসলামের পবিত্রতম দুই স্থানের রক্ষক এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক। এদিকে পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ।

গতকাল শুক্রবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তৈয়ব এরদোগানের মক্কায় পৌঁছানোর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির ওমরাহ পালন করেছেন। পরে তারা সৌদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরান-সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়ারা সৌদিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলা দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এ ছাড়া এসব সংঘাতের প্রভাব সৌদীর অন্যান্য উপসাগরীয় মিত্রদের ওপরও পড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। প্রায় এক বছর ধরে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। গত জানুয়ারিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছিলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে আঙ্কারা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মের পক্ষে। এরপরেই তিন দেশের এই চুক্তি হলো।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য প্রায় তিন বছর ধরে সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। এ সময়ে অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশই সীমান্তপারের হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র অথবা ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে। ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ চালানোর পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে দুটি বড় ধরনের বিমান অভিযানও চালিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে ইরানও সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও ইসরাইলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তবর্তী দেশ তুরস্ক ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সরাসরি হামলার শিকার না হলেও, দুই দেশই এমন সংঘাত দ্রুত বন্ধ করার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সৌদি আরবের জন্য গত কয়েক বছরের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আরও গুরুতর। দেশটির তেল রপ্তানি এবং উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা ঝুঁকিতে পড়েছে। মক্কায়, ইসলামের পবিত্রতম স্থানে, শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি তাই এই সামরিক সমঝোতাকে বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি তিন দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই অংশীদারিত্বে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরব প্রযুক্তি ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার মতে, এই চুক্তিতে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত ভারতের কাছ থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীভূত।

সৌদি বাহিনীকে কয়েক দশক ধরে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে পাকিস্তান। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ ও প্রশিক্ষণ বিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ বিনিময় হয়েছে।

২০২৩ সালে সৌদি আরব তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার জন্য একটি চুক্তি করে। আঙ্কারা এটিকে তুরস্কের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এর আগে রয়টার্সের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে।