কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশীর মধ্যে ছয়জনের লাশ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলকাতাস্থ বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ছয়জনের লাশ ভারত-বাংলাদেশের দুই সীমান্ত দিয়ে দেশে পাঠানো হবে। অপর এক বাংলাদেশী নাগরিকের লাশ পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতাতেই সৎকার করা হবে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের লাশ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। তারা হলেন, কুষ্টিয়ার দেবাশীষ দত্ত, আফসানা শারমীন, শর্ণশীষ দত্ত, মো. আকরাম আলী এবং সাভারের আহামেদ বাবু। এ ছাড়া সাতক্ষীরার বাসিন্দা এস এম আলিমুজ্জামানের লাশ ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কলকাতাস্থ বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনার মো. খালেদ জানিয়েছেন, গতকাল শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই লাশগুলো দেশে পাঠানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা সম্ভব না হলে লাশ দেশে পাঠাতে আজ শনিবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে নিহত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের বাসিন্দা রেবতী সরকারের লাশ পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে কলকাতাতেই সৎকারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তার লাশ কলকাতায় সৎকারের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রেবতী সরকারের ছেলে তার মায়ের লাশ কলকাতাতেই সৎকার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে এজন্য পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। বিষয়টি ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় সাত বাংলাদেশী নাগরিকসহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে দুইজন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার মার্কুইস স্ট্রিট এলাকার হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগ। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার অভিযোগে এলাকার আরও ১৭টি হোটেলের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হয়েছে। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে নয়টি আবাসিক হোটেল এবং চারটি রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নতুন ১৭টি হোটেলকে যুক্ত করলে এখন পর্যন্ত মোট ২৬টি হোটেল এবং চারটি রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী, আপাতত এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নতুন করে অতিথি রাখার অনুমতি থাকছে না। অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা খতিয়ে দেখতেই এই পদক্ষেপ বলে জানা গেছে।
আতঙ্কে সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরছেন বাংলাদেশী পর্যটকেরা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বোর্ডিং হাউসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশী নাগরিকসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যুর পর স্থানীয় পর্যটন খাতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর কলকাতায় অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশী পর্যটক তাঁদের নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে অবস্থানরত অনেকে ভারতে ভ্রমণের পূর্বপরিকল্পনা স্থগিত করছেন। নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, স্যাডার স্ট্রিট ও কলিন স্ট্রিট এলাকার হোটেল সমিতি ও ট্রাভেল এজেন্টরা নিশ্চিত করেছেন যে, গত কয়েক দিনে আগাম টিকিট কেটে দেশে ফেরার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে (প্রায় ১টা ৪০ মিনিটে) মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫জি নম্বর পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামে একটি বোর্ডিং হাউসে আগুনের সূত্রপাত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি পরিষেবা মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, হোটেলটিতে ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা বৈধ পরিচালন পারমিট ছিল না।
ঘটনার পরপরই কলকাতার পৌরসভা (কেএমসি) পুরো শহরের বোর্ডিং হাউসগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা পর্যালোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অডিট দল গঠন করেছে। পাশাপাশি, ভবনের মালিক বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধান পেতে কলকাতা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের খবর বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দেয়। ভারতে অবস্থানরত স্বজনদের অবিলম্বে সফর শেষ করে দেশে ফেরার তাগিদ দিচ্ছেন তাঁরা। অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই ভবনেই অবস্থান করছিলেন পাবনার বাসিন্দা মো. খুরশীদ আলম। পরে মারকুইস স্ট্রিটের অন্য একটি হোটেলে উঠে তিনি বলেন, ‘আগুনের খবর এবং পাঁচ বাংলাদেশীর মৃত্যুর পর আমার স্ত্রী ও বাবা-মা ক্রমাগত ফোন করে বাড়ি ফিরে যেতে বলছেন। আমি ব্যবসায়িক কাজে এসেছি, তাই দ্রুত কাজ শেষ করে গতকাল শুক্রবার বিকেলেই রওনা দেওয়ার কথা।’
প্রশাসনিক কড়াকড়ি বা তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার ভয়েও অনেকে এলাকা ছাড়ছেন। ঢাকার বাসিন্দা ইসমাইল সরকার বলেন, ‘আমরা চাই না এলাকার হোটেলগুলোতে চলা প্রশাসনিক অভিযানে আটকে পড়তে। তাই আপাতত ফিরে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আসাই শ্রেয় মনে করছি।’
কলকাতার স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট গোপাল মান্না বলেন, ‘অগ্নিদুর্ঘটনার পর অনেক পর্যটক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই আমাদের কাছে এসে জরুরি ভিত্তিতে ফিরতি টিকিট করে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।’
এই ঘটনার ফলে কলকাতার তথাকথিত ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। করোনা মহামারি এবং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই এলাকায় বাংলাদেশী পর্যটকদের দৈনিক আগমন ঐতিহাসিক গড় ৮ হাজার থেকে নেমে মাত্র ১ হাজার-এ পৌঁছেছিল। গত জুলাই মাসে ভিসা প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল হওয়ার পর ব্যবসায়ে মন্দা কাটতে শুরু করেছিল। তবে এই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ও পর্যটক কমে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় হোটেল ও খুচরা ব্যবসায়ীরা নতুন করে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।