আগস্টের শেষ সময়ে এসে ডেঙ্গু নতুন আতংক হিসেবে দেখা দিয়েছে। হামের আতংকের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানী ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে জেলা ও গ্রামাঞ্চলে আশঙ্কার বার্তা জানান দিচ্ছে মৌসুমি এই ভাইরাস। এতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বলা হচ্ছে, এতদিন ঢাকার ভেতরে ডেঙ্গুর আক্রমণ সীমাবদ্ধ থাকার প্রচলিত ধারণা ভেঙ্গে এখন জেলা হাসপাতালগুলোর বেড পূর্ণ হচ্ছে ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়ে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকে বাড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাইয়ের চেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি।

এদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭৭ জন মারা গেছেন। আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২২ জনে। তবে অন্যান্য বছরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন আর মূলত রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক নয়। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে কোনো কোনো এলাকায় ডেঙ্গু দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং সামনে পরিস্থিতি কোথায় বেশি খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সাধারণত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা সামনে আরো বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময়ে ঢাকায় মারা গেছেন ৩৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে ঢাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু সংক্রমণের হিসাব সামনে আনলে চলতি মৌসুমে খুলনায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত কেসিসি এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৮৮ জন। এ সময়ে ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ২৬৭ এবং মারা গেছে দুজন। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী রেড, অরেঞ্জ ও ইয়েলো জোনে ভাগ করে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে ক্র্যাাশ প্রোগ্রাম ও মোবাইল কোর্ট।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক জরিপেও চট্টগ্রাম নগরীর মশার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ৮ থেকে ১৮ জুন নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতেও লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৪৯৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ৫৩৬ জন, আর আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৬৬৩ জন। বর্তমানে জেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী। এই সময়ে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন।

আক্রান্তের সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশালের পিরোজপুর। সেখানে এক হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। চতুর্থ স্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। জেলায় ৯২৪ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে এখন পর্যন্ত ৭২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সেখানে এখনো কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারীবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এ বছর উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষ করে বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। তার মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা এবং বছরজুড়ে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করার প্রবণতা এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

বহুল ব্যবহৃত এডিস মশা মারার ওষুধের (মশানাশক) বেশির ভাগেই আর কাজ হচ্ছে না। এসব ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণির ছয়টি মশা নাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কোনো কোনো মশা নাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি যেসব অঞ্চলের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি বেশি, সেসব এলাকাতেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তিনি বলেন, অনেক এলাকায় মানুষ নিরাপদ পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন পাত্রে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করেন। এসব পাত্র এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় মূলত এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এলবোপিকটাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত শহরাঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও এডিস এলবোপিকটাস গাছপালাবেষ্টিত ও গ্রামীণ এলাকাতেও বিস্তার লাভ করতে পারে।

হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান ও বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই মশা বংশবিস্তার করে। অন্যদিকে গাছের কোটর, পাতার গোড়া বা প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা স্থানে এডিস এলবোপিকটাসের প্রজনন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শহর ও গ্রামের সব এলাকাতেই জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।