- বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ঘনমিটার ৯ টাকা ও যানবাহনে সিএনজি ২২ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব
দেশে চরম গ্যাস সংকট চলছে। এরই মধ্যে আরেকদফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস খাতের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা আসার পর সেগুলো যাচাই বাচাই করে পেট্রোবাংলা। পরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ঘনমিটার প্রতি ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেয় পেট্রোবাংলা। ভর্তুকি থেকে বের হয়ে আসতে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে সম্প্রতি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, পেট্টোবাংলার প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি অনুমোদন হলে পেট্রোবাংলায় ফেরত যাবে, এরপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে। তারপর শুরু হবে আইনগত প্রক্রিয়া।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা একই বছরে নভেম্বরে সার উৎপাদনে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.২৫ টাকা করা হয়। তবে এ দফায় অন্যান্য গ্রাহকের দাম বাড়ানোর কোন ইচ্ছে এখন পর্যন্ত নেই বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
সূত্র জানায়, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিগুলো চার্জ (বিতরণ চার্জ) বাড়ানোর আবেদন করেছে। কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ঘনমিটার প্রতি বিতরণ চার্জ ৩৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.২১ টাকা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯০ পয়সা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুই ধরণের ফর্মুলার প্রস্তাব করেছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে ২১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ পয়সা আর ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা প্রস্তাব করেছে।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ১৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬৩ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বিতরণের দায়িত্বে থাকা সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। কোম্পানিগুলো দাবি করেছে, বিতরণ মাশুল থেকে তাদের পরিচালন ব্যয় মিটছে না। কিছু কোম্পানি অপরিচালন আয় থেকে ব্রেক ইভেনে রয়েছে। পে-স্কেল চালু হওয়ায় এই খরচ আরও বেড়ে যাবে। ক্রমাগত লোকসান দিতে থাকলে এক সময় আদমজী জুট মিলের মতো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকহারে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩১.৬৫ টাকা (প্রতি ঘনমিটার), আর বর্তমানে গড় বিক্রয়মূল্য রয়েছে ২৩.৬৩ টাকা। এতে করে প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি থাকছে ৮.০২ টাকার মতো।
তবে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৩ মাস (জানুয়ারি-মার্চ) যেখানে গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। ওই ৩ মাস গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বিদেশ থেকে আমদানির পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় ৩টি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে থাকে পেট্রোবাংলা। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি ঘনমিটারের দাম দেওয়া হয় ১ টাকা, বাপেক্সকে দেওয়া হয় ৪ টাকা। শেভরন বাংলাদেশকে ১২ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৭৬ ডলার) আর টাল্লোকে দেওয়া হয় প্রায় ১০ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৩১ ডলার) হারে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়েছে ৪৬ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.৬৬ ডলার) এবং ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ৪৪ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.০৯ ডলার)।
এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে ২৮০০ মিলিয়ন পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। মজুদ কমে আসায় ১৬৫০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। বিদায়ী বছরে ৩০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, দেশীয় উৎস থেকে যোগান এসেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ২০৩০ সালে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ৩০ শতাংশে নেমে আসবে, আর আমদানির অনুপাত বেড়ে ৭০ শতাংশ হবে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।
দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৩১.৬৫ টাকা থেকে ৪৫.৭৯ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানি করতে গিয়েই দাম সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির পর কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ নিয়ে নানা রাজনীতি বিদ্যমান। এক সময় বলা হলো গ্যাসের উপর ভাসছে দেশ, আবার আরেক সময় বলা হলো গ্যাস নেই আমদানি করতে হবে। এই রাজনৈতিক খেলার কারণে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও তিমিরেই বলা চলে। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে ৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করার কথা বলা হয়। কিন্তু কোন সরকারেই সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারের কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। যে কারণে গ্যাস খাতের অবস্থা অনেকটা বেসামাল বলা চলে। সংকটের কারণে প্রায় সবধরনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ বলা যায়। এতে করে থমকে রয়েছে শিল্পায়ন। আবার বিদ্যমান শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
তিতাসের সতর্কতা ;
মহেশখালীস্থ এলএনজি (এলএনজি) টার্মিনালসমূহে কারিগরি ত্রুটির কারণে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে। এর ফলে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজিসহ সব ধরনের গ্রাহক তীব্র গ্যাসের স্বল্পচাপের মুখে পড়বেন বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানায়, মহেশখালীস্থ এলএনজি টার্মিনালসমূহের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে আরএলএনজি সরবরাহ প্রায় ৫৫০ এমএমসিএফডি কমে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের অধিভুক্ত সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের সাময়িক ভোগান্তি অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে বিঘ্ন ঘটছে। অনেক এলাকায় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।