যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অভিমুখে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে অর্জিত এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সফররত মার্কিন প্রতিনিধিদলের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র সচিব এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি খাত ও অভিবাসনসহ দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত ট্যারিফ বা শুল্ক কাঠামোর সুফল বাংলাদেশ পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি বিশেষ শুল্ক কোটা সুবিধা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার আরও বৃদ্ধি পাবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং বাংলাদেশ আশা করে এই মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি মিয়ানমারে মার্কিন হিউম্যান করিডোর তৈরির বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উড়িয়ে দেন তিনি। বৈঠকে চীন-ভারত বিষয়ক উদ্বেগ, কোনো দেশের সাথে আঞ্চলিক করিডোর নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান মন্ত্রী। একই সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর নতুন সরকারের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের এনগেজমেন্ট ও সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিমানের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বোয়িং বিমান কেনার বিষয়টি মার্কিন প্রতিনিধিদলকে অবহিত করার কথা জানান ড. খলিলুর রহমান। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, সেই ধারাবাহিকতায় জেনারেল অ্যাসেম্বলির সভাপতি হিসেবে তাঁর সাথে মার্কিন প্রশাসনের এই আলোচনা ও ইন্টারঅ্যাকশন চলমান থাকবে।

ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর ঢাকায়: যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিনদিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে এই তথ্য জানানো হয়। পোস্টে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘আমার বন্ধু, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে পেরে আমি আনন্দিত। তার এই সফর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।’

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আজ শুক্রবার তার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্ততা এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্জিও গোর হচ্ছেন ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা সফরকারী যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এর আগে মার্চে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ বাংলাদেশ সফর করেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সার্জিও গোরের সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান এবং ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, একই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের মূল্যায়নও এ সফরে প্রতিফলিত হতে পারে। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তাও তিনি বাংলাদেশের নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের আগস্টে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা সার্জিও গোরকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন। ওই পদে নিয়োগের পর থেকে তিনি ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সার্জিও গোর দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। নয়াদিল্লিকে কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে রেখে তিনি ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গোরের নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর সেই আঞ্চলিক কৌশলেরই প্রতিফলন।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আভাস দিলেন মার্কিন দূত: দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর বাংলাদেশে তার প্রথম সরকারি সফর শেষে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশে আমার প্রথম সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করতে পেরে ভালো লেগেছে। অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।’