• ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পরামর্শ দেয়ার অনুরোধ বিরোধী দলীয় নেতার
  • গণমাধ্যমের ওপর সরকার অন্যায় পদক্ষেপ নিলে বিরোধী দলকে পাশে চায় সম্পাদকরা
  • বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা অতীতের তুলনায় ব্যতিক্রম
  • প্রয়োজন হলেও রাজপথের কর্মসূচি যেন কোনোভাবেই পূর্বের মতো অসহিষ্ণু না হয়

জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের সাথে বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান মতবিনিময় করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ছয় মাসের সংসদীয় পথচলায় এই প্রথম দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব। ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, বর্তমান জাতীয় সংকট এবং ‘জুলাই সনদের’ ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে দলটির অনড় অবস্থান এই মতবিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। আমীরে জামায়াত মিডিয়াকে ‘ফোর্থ স্টেট’ বা ‘ফোর্থ ডাইমেনশন’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং জামায়াতে ইসলামীর কোনো ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পরামর্শ দিতে অনুরোধ করেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, দ্যা ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ, দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ডেইলি ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান, দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, দৈনিক কালবেলা পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, দৈনিক এদিন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক খন্দকার মোজাম্মেল হক, দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল, দৈনিক ভোরের ডাক পত্রিকার সম্পাদক কে, এম, বেলায়েত হোসেন, আজকের পত্রিকার সম্পাদক কামরুল হাসান, দৈনিক দেশ রূপান্তরের নির্বাহী সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্য প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, দৈনিক করতোয়া পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, দৈনিক জনতা পত্রিকার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন, আগামীর সময় পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা মামুন, দ্যা নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক মো. মোকাররম হোসেন, গ্রিন ওয়াচ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, শীর্ষ কাগজ সম্পাদক একরামুল হক, দিনের আলোর সম্পাদক ফজলুর রহমান জুলফিকার, দ্যা ইভিনিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক এ বি এম সেলিম আহমেদ, ঢাকামেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, ডেইলি সান পত্রিকার উপসম্পাদক আল আমিন, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান, দৈনিক সংগ্রামের বার্তা সম্পাদক সামছুল আরেফীন, সাপ্তাহিক সোনার বাংলার বার্তা সম্পাদক ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া প্রমুখ।

মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলনা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি), মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আব্দুর রব, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, উত্তরের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মাদ জাহিদুর রহমান ও দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি ও আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।

সাংবাদিক সম্মেলনে সভার বিস্তারিত তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, অতীতে প্রচলিত ও প্রথাগত বিরোধীদলের যে খারাপ অনুশীলন ছিল; সেই প্রথা ভেঙে দিয়ে দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা এবং সকল অন্যায় ও গণবিরোধী কাজের প্রতিরোধ করতে জামায়াত যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরেছেন আমীরে জামায়াত। জামায়াতের এই পলিসির প্রশংসা করেছেন সম্পাদকমন্ডলী।

তিনি বলেন, জামায়াতের বিরোধিতা হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক। বৈঠকে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। এ মতবিনিময় সভায় জামায়াতের পলিসি বা নীতি তুলে ধরা হয়েছে। রাজপথে বিরোধীদল আন্দোলন করলেও দেশ যেন অস্থিতিশীল না হয় সেই পরামর্শ দিয়েছেন সম্পাদকরা।

সরকারের ছয়মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এটি সম্পাদকদের সাথে প্রথম মতবিনিময়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারি দল জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের এমপিদের সাথে বৈষম্য করছে। তারা উন্নয়নমূলক কাজে, বরাদ্দে এমনকি সংসদে কথা বলার ক্ষেত্রে, আইন প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে, নানা নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্য করছে।

জামায়াত বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস সংকট, গণভোটের গণরায় কার্যকর করার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার ও প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু তারপরও স্পিকারের পক্ষ থেকে আমরা ইনসাফপূর্ণ আচরণ পাইনি। বরং বৈষম্যের শিকার হয়েছি। এগুলো আমীর জামায়াত তুলে ধরেছেন।

সম্পাদকদের লেখনির মাধ্যমে সত্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত বলেছেন, গণতন্ত্রের উত্তরণে আপনারা দায়িত্বশীলতার সাথে সহযোগিতা করবেন। সংসদের অতীতের বিরোধীদলগুলোর তুলনায় জামায়াত ব্যতিক্রম বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন সম্পাদকরা। জামায়াত সংসদকে গঠনমূলক পন্থায় কার্যকর রাখতে চায়। এজন্য সরকারকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু বিরোধীদল এটি করতে পারবে না।

সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি শক্তিশালী ও গঠনমূলক বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংকটকে ঘনীভূত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করতে চায়। সিনিয়র পলিটিক্যাল করেসপন্ডেন্ট হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে, দলটি প্রথাগত সহিংস ও অস্থিতিশীল রাজনীতির বিপরীতে ‘ইনসাফভিত্তিক’ সংসদীয় চর্চায় মনোনিবেশ করছে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিরোধী দলকে ‘ভালো কাজে সমর্থন ও মন্দের প্রতিবাদ’ এমন ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে দেখে সম্পাদকরা এটিকে রাজনীতির এক ইতিবাচক বিবর্তন হিসেবে সভায় অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, উপস্থিত সম্পাদকরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথের কর্মসূচি প্রয়োজন হলেও তা যেন কোনোভাবেই পূর্বের মতো অসহিষ্ণু, অস্থিতিশীল বা সহিংস পথে না যায়। তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থে জামায়াতকে শান্ত ও নিয়মতান্ত্রিক ধারায় অটল থাকার আহ্বান জানান। দীর্ঘ ছয় মাস পর সম্পাদকদের সাথে এমন আনুষ্ঠানিক ও খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি হওয়াকে তারা সাধুবাদ জানান এবং এর ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর জোর দেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পাদকদের এই ইতিবাচক মূল্যায়ন জামায়াতে ইসলামীকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করবে। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের’ ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁতে ভোট দিয়ে’ যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার গড়িমসি করছে। আইনমন্ত্রী গণভোটের ৪টি বিষয়ের মধ্যে সাড়ে ৩টিতে একমত হলেও বাকি অর্ধেক ইস্যুতে অমত পোষণ করায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত স্পষ্ট করেছে যে, জনগণের এই ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে তারা ‘তিল পরিমাণ ছাড়’ দেবে না। এসব সংকট সমাধানে এবং জনগণের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে জামায়াত সম্পাদকদের কলম ও লেখনীর মাধ্যমে সহযোগিতা কামনা করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আপনাদের লং মার্চ, সভা, সমাবেশসহ আন্দোলনের কোনো ভিত্তি নেই। এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, যারা এ কথা বলেন, তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা নেই। তারা কেবল সরকারকে খুশি করতে ‘চাটুকারিতা’ করছেন। বর্তমানে ‘গণভোটের রায়’ দেশের প্রধান ইস্যু।

জনমত গঠন ও রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অংশ হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৫ তারিখ সকাল ৭টায় ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে এক বিশাল লং মার্চ ও গাড়িবহর যাত্রা করবে।

কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির রুট বরাবর সাধারণ মানুষকে এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করতে জামায়াত গণমাধ্যমকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণের দৃঢ় সহযোগিতা কামনা করেছে।

সম্পাদকদের চাওয়া: দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সহযোগিতা কামনা করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি মিডিয়াকে ‘ফোর্থ স্টেট’ বা ‘ফোর্থ ডাইমেনশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জামায়াতে ইসলামীর কোনো ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পরামর্শ দিতে অনুরোধ করেছেন। মতবিনিময় সভায় সম্পাদকদের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে যদি কোনো গণমাধ্যমের ওপর সরকারি কোনো অন্যায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে বিরোধী দল যেন তার প্রতিবাদ করে।

গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে এ কথা বলেন সম্পাদকদের নতুন সংগঠন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে, কোনো দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর আস্তে আস্তে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে সরকার। যদিও আমরা আশা করছি, বর্তমান সরকার তেমন হবে না। তবে যদি কোনো গণমাধ্যমের ওপর সরকারি কোনো অন্যায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে সেটি সেই গণমাধ্যম বিরোধী দলকে সমর্থন করে কি করে নাÑ তা বিবেচনা না করেই যেন বিরোধী দল তার প্রতিবাদ করে। বিরোধী দলের নেতা এই কাজে পাশে থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা মিডিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তিনি বলেছেন যে তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করছেন এবং তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। তো সেই সঙ্গে তারা কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের মনঃকষ্টের কথা জানিয়েছেন। যেমন তারা বলেছেন যে তারা জ্বালানি নিয়ে একটা বিশেষ অধিবেশন করতে চেয়েছিলেন। সরকার থেকে এখন পর্যন্ত সেটার সাড়া দেয়নি। তারপরেও তারা এই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে চান এবং পার্লামেন্টকেই সব কর্মকাণ্ডের মূল জায়গা করতে চান।

তিনি বলেন, সম্পাদকদের মধ্য থেকে আমরা বলেছি যে, জুলাই বিপ্লবের পরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে। মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরে এসেছে এবং আমরা বলেছি যে আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। আমরা আমাদের মিডিয়ার মেইনস্ট্রিম দায়িত্ব প্রফেশনালি আমরা পালন করবো।

তিনি আরও বলেন, আরেকটা বিষয়ে আমার তরফ থেকে একটা পরামর্শ ছিল। আমি শ্যাডো ক্যাবিনেট তৈরি করার কথা বলেছিলাম। আমি ওনাদেরকে বলেছি যে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটা অভ্যাস বা চরিত্র আছে যে তারা সব বিষয়ে কথা বলেন। তো বিরোধী দলের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা হলো যে সবাই সব বিষয়ে কথা না বলে যদি শ্যাডো কবিনেটটা করা যায়, তাহলে যেমন জনগণের জন্য ভালো হয়, তেমনি সরকারও সবসময় একটা চাপের মধ্যে থাকে। আর বিরোধী দলের জন্য এক ধরনের ট্রেনিং হয়ে যায়। কারণ আমরা জানি যে বিরোধী দল মানে কী। আগামী নির্বাচনে যদি জনগণ তাদের ভোট দেয়, তারা সরকারে যেতে পারে। তো শ্যাডো ক্যাবিনেট হলে পরে তাদের ট্রেনিংটাও হয়ে যায়। তিনি (বিরোধী দলীয় নেতা) এটাকে এপ্রিশিয়েট করেছেন এবং জানিয়েছেন যে একটা শ্যাডো ক্যাবিনেট তারা ইতোমধ্যে করে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদেরকে জানান নাই। সেই শ্যাডো ক্যাবিনেটের নাকি প্রশিক্ষণ চলছে এবং অল্পদিনের মধ্যেই তিনি আমাদেরকে জানাবেন।

সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, সভায় মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান জানতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি (বিরোধী দলীয় নেতা) বলেছেন যে, প্রতিবেশী তো প্রতিবেশী। একটা প্রতিবেশীর সঙ্গে আরেক প্রতিবেশীর যেমন সম্পর্ক থাকে, তারা ওই সম্পর্কই চান। এত বেশিও না যে বাংলাদেশের সবকিছু উজাড় করে দিতে হবে। আবার সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে যেন কোনো শত্রুতাও না থাকে। তিনি 'ইকুয়ালিটি' বা গাণিতিক সমানাধিকারের চেয়ে 'ইক্যুইটি' বা ন্যায্যতার ওপর জোর দিয়েছেন।

মতবিনিময় সভা শেষে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেই তো সরকার। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমাদেরকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। আমরা এসেছিলাম। তারা মিডিয়া সম্পর্কে খুবই সুন্দর কথা বলেছেন। মিডিয়ার ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আমরা আমাদের পরামর্শ দিয়েছি।

তিনি বলেন, আমি একটা বিষয়ে তাদেরকে অনুরোধ করেছি যে, এদেশে আমরা একটা ফ্যাসিবাদী পর্যায় অতিক্রম করে এসেছি। আরেকটা পর্যায় আমরা অতিক্রম করে এসেছি যে, নির্বাচিত সরকারের আমলে বিরোধী দলের নামে নৈরাজ্য হয়েছে আন্দোলনের নামে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে পার্লামেন্টের ভেতরে থাকতে হবে। সরকারকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের ধারার মধ্যে থাকতে হবে, যাতে ফ্যাসিবাদ এবং বিরোধীদলীয় নৈরাজ্য কোনোটাই ফিরে না আসেÑ এই আহ্বান আমরা জানিয়েছি।

দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, মতবিনিময় সভায় জামায়াতের আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা প্রথমে একটু স্পিচ দিয়েছেন। সম্পাদকদের পক্ষ থেকে অনেকে কথা বলেছেন। একটা প্রাণবন্ত ডিসকাশন হয়েছে এবং সবাই প্রাণ খুলে কথা বলেছেন। বিরোধী দল কী করছে এবং তাদের কী করা উচিতÑ মানে কনস্ট্রাক্টিভ কিছু ক্রিটিসিজম এবং অ্যাডভাইস পুরোটাই আলোচনায় ছিল।

জামায়াত আমীর এই সরকারের প্রথম ছয় মাসে তাদের পারফরমেন্স, সরকারের পারফরমেন্স, মিডিয়া ফ্রিডমের কথা বলেছেন। বাংলাদেশে এখনো সেই সত্যিকার অর্থে মিডিয়া ফ্রিডম আসেনি, জুডিশিয়াল ফ্রিডমেও কিছু ব্যর্থ হয়েছেÑ সেগুলোর কথা বলেছেন। আর তিনি তার দলের পারফরমেন্সের উপরে হাইলাইট করেছেন।

আর সম্পাদকদের তরফ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, আমরা এর আগে দেখেছি যে সরকার ফেল করেছে। আওয়ামী লীগ একটা মনস্টার হয়ে গিয়েছিল। একটা ফ্যাসিস্ট, অটোক্রেটিক সরকার ইস্টাবলিশ করে তারা বিরোধী দলের কোনো স্পেসই রাখেনি, রাজনীতিই করতে দেয়নি। তেমনি আগে বিরোধী দলও যে খুব দায়িত্বশীল আচরণ করেছে তা-না। বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের পার্লামেন্টকে দাঁড়াতেই দেয়নি। তারা কথায় কথায় ওয়াকআউট করেছে। কথায় কথায় হরতাল ডেকেছে। ফলে বাংলাদেশে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের যে আচরণ করার কথা, সেটা তেমন একটা হয়নি। সবাই এ বিষয়ে বলেছেন যে, পার্লামেন্ট যাতে সেন্টার অফ অল অক্টিভিটিস হয়। পার্লামেন্ট যাতে ট্রুলি বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে। এ বিষয়ে প্রত্যেক সম্পাদক একইভাবে সুরে কথা বলেছেন।