স্টাফ রিপোর্টার

বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়ন নিয়ে এনসিপি বলেছে, ছয় মাস পর তথ্য-উপাত্ত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা গেছে, এই তিনটি অগ্রাধিকারের প্রতিটিতেই সরকার নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানী সংকটে কল-কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিকেরা চাকুরি হারাচ্ছে। কৃষককে উচ্চমূল্যে সার কিনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের নজিরবিহীন সংকট শিল্প উৎপাদন, কৃষিখাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছে; নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে; ব্যাংকিংখাতের লুটেরারা পুনরায় ফেরত আসছে; ভোগ্যপণ্য ও আমদানি বাজারে পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে এবং বিএনপি তাতে নতুন অংশীদার হিসাবে যুক্ত হচ্ছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৮০ দিনে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেই দেশকে পরিচালনা করার। অপরিণামদর্শিতা ও অসততার দৃষ্টান্ত তৈরি করে সরকার পুরোনো ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোয় ফেরত যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন-অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা’ নামের একটি পুস্তিকা পড়ে শোনান নাহিদ ইসলাম। এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সংস্কারগুলো, যেমন ঃ মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়, একে একে বাতিল করা হয়েছে। এসবের জায়গায় আগের চেয়ে দুর্বল ও অকার্যকর আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। বহুল প্রচারিত ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারকে ছুঁড়ে ফেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে নির্লজ্জ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত অগ্রাধিকার পলিসিতে বিচার ও শহীদ পরিবার-আহতদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন অনুপস্থিত।

বিরোধী দল-মত ও সাংবাদিকদের ওপর সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের হামলা-মামলার ঘটনা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের পরিবর্তে হামলায় আহতদের আইনিভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। পুলিশকে ফের দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হচ্ছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই সনদ ভঙ্গ করেছে। বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন মূলতঃ অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা এবং অসততার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশের পাম্পগুলোতে ভয়াবহ পেট্রোল ও ডিজেল সংকট দেখা দেয়। পাম্পগুলোর সামনে কয়েক মাইলজুড়ে তৈরি হয় গণপরিবহণ, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি; এক লিটার তেলের জন্য অনেককে টানা ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সংকটের মধ্যেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়ায়; প্রতি লিটারে ডিজেলে ১৫ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা। এর প্রভাবে গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেন, এই সংকটের পেছনে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের ভূমিকা দেখা গেছে। পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে তেল মজুদ রাখার ঘটনা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক অভিযানে উঠে এসেছে। সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গত দেড় মাস ধরে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট। ঢাকার মতো শহরে দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা চুলা জ্বলছে না, আর লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে শিল্পকারখানায় এত দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহে এমন সংকট বিরল। গৃহস্থালিতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে রান্না করতে হচ্ছে।

নির্দিষ্ট কিছু কারাখানায় উৎপাদন ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কাচ, ইস্পাত, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সিরামিক ও বেকারি শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে গ্যাসের চাপ কোথাও শূন্যে নেমে গেছে।

বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড হয়েছে উল্লেখ করে এই জুলাইযুদ্ধের আহ্বায়ক বলেন গ্রাম ও মফস্বলে দিনে ১০ ঘণ্টারও বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লসের দায় গ্রাহকদের ওপর চাপানো হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের দুর্বল মনিটরিং ও রাজনৈতিক-সমর্থনপুষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের প্রতি বস্তা সারে অতিরিক্ত ৩৫০-৪৫০ টাকা গুনতে হচ্ছে। জ্বালানি পাম্পের মতোই এখন সারের দোকানেও দীর্ঘ সারি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকরা অসাধু ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পাহাড়সম আকার নিয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফোনকলে ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের রদলবদল হচ্ছে। একদিকে, এস আলমের মতো ব্যাংক লুটেরাদের এবং লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনার দৃশ্যমান কার্যক্রম নাই। অন্যদিকে, খেলাপী ঋণকে পুনঃতফশিলীকরণের হিড়িক পড়েছে। ইধহশ জবংড়ষঁঃরড়হ অপঃ, ২০২৬-এর ১৮ক ধারার মাধ্যমে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ অলিগার্কদের ফের ব্যাংক দখলের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও জনগণের ব্যাপক সমালোচনার মুখে ধারাটি প্রত্যাহার করা হয়। তবুও ইসলামী ব্যাংক দখলের আশঙ্কায় অনেক গ্রাহকরা আমানত তুলে নিতে বাধ্য হন।

১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধনীতি, যার অন্যতম স্থপতি ছিলেন প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশে সুলভ ও মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ এবং একটি শক্তিশালী দেশীয় ওষুধশিল্প গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করেছিল। যার ফলে আজ দেশ নিজের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা নিজেই মেটায় এবং বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি করে। ১৯৯৪ সালে মূল্যনিয়ন্ত্রণের আওতা সংকুচিত করে মাত্র ১১৭টি ওষুধে সীমিত করা হয়, যা পরবর্তী তিন দশকে হালনাগাদ হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কাঠামো সংস্কার করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২৯৫টিতে সম্প্রসারণ করে এবং একটি নতুন বৈজ্ঞানিক মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতি (অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬' ও 'ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬') প্রবর্তন করে, যা জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল।

বিএনপির ৩১ দফার একটি দফা ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, অথচ নির্বাচিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, “সংবিধান সংস্কার হয় না, সংবিধান সংশোধন হয়।” সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সরকার নিজস্ব দলীয় উদ্যোগে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠন করেছে। এটি স্রেফ ছলচাতুরি এবং চোখে ধুলা দেওয়া। কারণ, সংসদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই সংবিধান সংশোধন সম্ভব এবং পৃথক কমিটির প্রয়োজন নাই। এভাবেই এই সরকার নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা এবং সংস্কার প্রস্তাবনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উল্টা রথযাত্রা শুরু করেছে।

পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের সন্তানরা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারি কাজে নিয়োগ পাচ্ছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এডহক কমিটিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের পুত্র সৈয়দ ইব্রাহীম আহমেদ (যিনি বিসিবির টেন্ডার ও পারচেজ কমিটিতেও আছেন), মির্জা আব্বাসের পুত্র ইয়াসির আব্বাস এবং আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পুত্র ইসরাফিল খসরুকে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পুত্র মীর সীমান্তের কোম্পানিকে বগুড়ার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারিত্ব দেওয়া হয়েছে; তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ইউনিয়নের নামকরণেও পারিবারিক নাম ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। জনগণের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে এসব নির্লজ্জ বালখিল্যতা সংশোধন করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬-ও ল্যাপস করা হয়েছে। তার পরিবর্তে বর্তমান প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগ পুলিশ নিজেই তদন্ত করবে; তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পরিবার সশ্রম কারাদ-ের মুখে পড়তে পারে। এই কাঠামো প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানাতেও নিরুৎসাহিত করবে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে গুম থেকে সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে। যার ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হতে হবে। অভিযুক্ত বাহিনী নিজেই নিজের তদন্তে অংশ নিতে পারবে না মর্মে জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও স্পষ্টভাবে বলেছে। খসড়া বিলের ১৪ ধারা এই ন্যূনতম মানও পূরণ করতে পারে নাই।

বিএনপির ৩১ দফায় স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। জুলাই জাতীয় সনদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দফায় নোট অব ডিসেন্ট দিলেও এই দফায় বিএনপি কোনো আপত্তি জানায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করে সচিবালয় গঠনও করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে সচিবালয়টি বিলুপ্ত করে দিয়েছে। নিজেদেরই প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়িত হওয়ার পর তা বাতিল করা কেবল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রতারণা নয়; বরং বিচার বিভাগের প্রতি সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য থাকার প্রমাণ। সরকার অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগেও থাবা বসানোর চেষ্টা করছে। অবশ্য বিএনপি সরকারের এমন রোগ বেশ পুরোনো।

পাঁচ. আইনশৃঙ্খলা, দখল ও চাঁদাবাজি

তিনি বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মার্চ থেকে জুলাই এই পাঁচ মাসে থানায় মামলা হয়েছে ৮৮,২১৭ টি, যার মধ্যে হত্যা ১,৫৩৯টি, নারী-শিশু নির্যাতন ৯,৯৮৪ টি, ডাকাতি/ছিনতাই ২,৩৯৭ টি, চুরি ৪১৭৪ টি, মাদক মামলা ৩০,৮২৩ টি, চোরাচালান ১,০৫৬টি। এসময়ে সারাদেশে মাসে গড়ে ৩০৮ টি হত্যাকান্ড হচ্ছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় প্রায় ১০% বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় চুরি, ডাকাতি/ছিনতাই, নারী-শিশু নির্যাতনের মামলা, মাদকের মামলা, চোরাচালানের মামলা সবকিছুই বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মোট ৮৩০ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত ও ৫২৪৬ জনের অধিক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। আর ৮৩০ টি ঘটনার মধ্যে ৭৭০টিতেই বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাত্র ছয় মাসে বিএনপির নিজস্ব দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজির হিস্যা, দখলদারিত্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৭৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে অন্তত ৩১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ৪০০ জন নারী-কিশোরী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০১ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ৪০ জনকে হত্যা করা হয়েছে; উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। (এইচআরএসএস ও আসকের প্রতিবেদন)

একদিকে সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। অপরদিকে, অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেওয়া ছাত্রদল নেতাকেও মুচলেকায় ছেড়ে দিয়ে নিজ দলের সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করছে।

শিক্ষাঙ্গনে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস

ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল পুরনো কায়দায় দখল ও সন্ত্রাস ফেরত এনেছে। এতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। শাহবাগ থানার অভ্যন্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও ডাকসু নেতৃবৃন্দের ওপর ছাত্রদলের হামলার পরও কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশক্তি ও জকসু নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা, এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও বুটেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গত ছয় মাসে শিক্ষার্থী ও বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে ছাত্রদল। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের সামনেই এসব হামলা সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং একটি ঘটনায় লাঠি হাতে একজন পরিচিত যুবদল নেতাকে প্রকাশ্যে পুলিশকে নির্দেশ দিতে দেখা গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমান সরকার-নিযুক্ত প্রশাসন বাকি ক্যাম্পাসগুলোতে নির্বাচন আটকে রেখেছে।

অভ্যুত্থানের ইতিহাস দলীয়করণ

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ছাত্রনেতৃত্বের গণঅভ্যুত্থানকে দলীয় ইতিহাসে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছে বিএনপি সরকার। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে এক দফা থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রকৃত নায়কদের আড়াল করে তা বিএনপির দলীয় আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এনসিপি ও আহতযোদ্ধাদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ভুল স্বীকার করেন।

এছাড়াও, জুলাই জাদুঘর থেকে ফেলানি ও সীমান্ত হত্যাবিরোধী লড়াই, আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের একাধিক নিদর্শন সরকারি হস্তক্ষেপে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এভাবে সরকার অভ্যুত্থানকে জনগণ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেদের দলীয় ইতিহাসে পরিণত করার পাঁয়তারা করেছে।

৮.৩ আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গাফেলতি

অভ্যুত্থানের দুই বছর অতিবাহিত হলেও জুলাইয়ের আহতযোদ্ধাদের দুর্ভোগ এখনও শেষ হয় নাই। সম্প্রতি জুলাইয়ে পায়ে গুলি খেয়ে আহত একজন শিক্ষার্থীর পা কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তাররা। এভাবে অনেক জুলাই আহত এখনো চিকিৎসাসেবা নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের পুনর্বাসন নেই। ঔষুদের খরচ নেই। কিন্তু এসব নিয়ে সরকারের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ও দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায় নাই।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকার দ্বিধান্বিত অবস্থায় আছে। কখনো প্রবল আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সীমান্ত হত্যা বন্ধ্যা সরকার দুয়েকটা কড়া বিবৃতি ব্যতীত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের কড়া বিবৃতি, অন্যদিকে জুলাই জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যার অন্যতম প্রতিরোধী নিদর্শন ফেলানীর চিত্র সরিয়ে ফেলা - কোনো আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজিরের গ্রেফতারের খবর পড়ে উচ্ছ্বসিত হন। কিন্তু তার দুই মাস পরেও এই আসামীকে ফেরত আনার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায় নি।