সংগ্রাম ডেস্ক: অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন, প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা হস্তান্তর, ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ, ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত, লুটেরাদের পুনর্বাসন রোধ (আইন সংশোধন) এবং সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীগণ যে, অসত্য ও বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তা প্রত্যাহারের দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীর মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল সোমবার বিক্ষোভ মিছিল শেষে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক সভাপতিত্ব করেন। সদস্য সচিব মোতাছিম বিল্লাহ সমাবেশ পরিচালনা করেন। এতে ব্যাংকের গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা বক্তব্য দেন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক অভিযোগ করেন, সরকারের ভেতরে থাকা এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগীদের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা-সংক্রান্ত বিচারিক মামলায় চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের দায়ের করা মামলা যখন নিষ্পত্তির কাছাকাছি, ঠিক সেই সময়ে ব্যাংকের আইনজীবী পরিবর্তন করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপের পক্ষে রায় নেওয়ার জন্য ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাইয়ুমকে পরিবর্তন করে সরকারদলীয় একজন জুনিয়র আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষের আইনজীবীকেও পরিবর্তন করা হয়েছে।

অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, এর মাধ্যমে সরকার আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিচারের নামে প্রহসনের কোনো রায় ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা মেনে নেবেন না।

অন্য সব ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া একটি ব্যাংক চলতে পারে না। তাই দ্রুত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনের জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানান।

৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের চলমান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৭ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে খুব শিগগির মহাসমাবেশসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

সচেতন গ্রাহক ফোরাম বলেছে, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়। এটি দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস, আবেগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা রক্ষায় অবিলম্বে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

ফোরাম আরও বলেছে, গ্রাহকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই পিছপা হবে না। তাদের দাবি, দীর্ঘ দুই মাসেও বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ গ্রাহকেরা আমানতের সুরক্ষার জন্য আন্দোলন করলে সেখানে রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটিকে তারা দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেছে।

সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দফা দাবি হলো-

১. পেশাদার পর্ষদ গঠন: অবিলম্বে অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।

২. প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর: ২০১৭ সালে গায়ের জোরে ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করে এই ব্যাংকের যে বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সাধারণ গ্রাহক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এই ব্যাংককে পুনরায় কোনো লুটেরা বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের শিকার হতে দেওয়া যাবে না।

৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকার এবং তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এস আলমসহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ: ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রোধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত: একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে লুটেরাদের বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে তারা যাতে কোনো প্রকার ‘স্থিতাবস্থা’ বা আইনি সুবিধা না পায়, সেজন্য প্রয়োজনে দ্রুত আইন সংশোধন করতে হবে। (উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এই আদালত থেকে এস আলমের ঋণের কোনো অনিয়ম তদন্ত করা যাবে না মর্মে রুলনিশি জারি করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক)।

৬. লুটেরাদের পুনর্বাসন রোধ (আইন সংশোধন): ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী মহোদয় লুটেরাদের পুনরায় ব্যাংকে পুনর্বাসনের যে ছদ্মবেশী সুযোগ রাখা হয়েছিল তা বন্ধ করার জন্য ১৮/ক ধারা বাতিল হবে মর্মে সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু বিল আকারে উপস্থাপনের মাধ্যমে তা এখনো রহিতকরণ করা হয়নি। তাছাড়া এ ধরণের অপকর্মকারীদের আজীবন ব্যাংক তথা অর্থনৈতিক সেক্টরে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

৭. সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী মহোদয়গণ যে, অসত্য ও বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তা অনতিবিলম্বে তা প্রত্যাহার করতে হবে।