চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলার কলেজ বাজার এলাকায় কাভার্ডভ্যান ও মাইক্রোবাসের ভয়াবহ সংঘর্ষে নারীসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর এবং অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে কলেজ বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত চারজনের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই-বোন এবং তাদের মামা রয়েছেন। নিহতদের সবাই কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা।
নিহতরা হলেন-নিয়াজ মোর্শেদ (২২), তার ছোট বোন মিমতাহ (১৭), তাদের মামা মো. ফেরদৌস আলম (৫৫) এবং মাইক্রোবাসের চালক মো. মুন্না (৪০)। তাদের মধ্যে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় অন্যদের সঙ্গে চালক মুন্নাকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, শাহ আমানত সেতু পার হয়ে আসা একটি কাভার্ডভ্যান কলেজ বাজার এলাকায় দ্রুতগতিতে ইউটার্ন নেওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার শব্দে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সংঘর্ষের পর মাইক্রোবাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।
আহত ১১ জনকে দ্রুত উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় পর্যবেক্ষণে রাখেন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
দুর্ঘটনায় পড়া মাইক্রোবাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-চ-১২-৯৫১৬ এবং কাভার্ডভ্যানটির নম্বর চট্টগ্রাম মেট্রো-শ-১১-৪৪৭৪ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর আহমদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১১ জন। দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস ও কাভার্ডভ্যান জব্দ করা হয়েছে। তবে কাভার্ডভ্যানের চালক ও সহকারী দুর্ঘটনার পর পালিয়ে গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাভার্ডভ্যানের চালক দ্রুতগতিতে ইউটার্ন নেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে দুই যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে-তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
নিহত ও আহতদের অধিকাংশই কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই পরিবারের দুই ভাই-বোন এবং তাদের মামার মৃত্যুতে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের আবহ।
রাতেই স্বজনরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিতে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ায় স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কলেজ বাজারসহ বিভিন্ন অংশে রাতের বেলায় যানবাহনের বেপরোয়া গতি প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে মহাসড়কের ব্যস্ত অংশে ইউটার্ন নেওয়ার সময় চালকদের অসতর্কতা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দ্রুতগতিতে ইউটার্ন নেওয়া এবং বিপরীতমুখী যানবাহনের গতিপথ যথাযথভাবে বুঝতে না পারার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। তবে এটি কেবল প্রাথমিক ধারণা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিহতদের লাশ প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি পলাতক কাভার্ডভ্যানের চালক ও সহকারীকে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গভীর রাতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ইউটার্ন ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের সতর্কতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।