স্টাফ রিপোর্টার

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও ১১ দলীয় ঐক্য কেন প্রার্থী দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জয়-পরাজয় তাদের কাছে মূল বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সামনে নিয়ে আসাই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করা হলে ১১ দলীয় ঐকের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের আওতায় আসতো। তখন সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন।

গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশন থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা ইলেকশনে অংশগ্রহণ করবো দলীয়ভাবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে জয়-পরাজয়টা বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে আমরা একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সামনে নিয়ে আসছি।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ রাষ্ট্রপতির পদেও যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের যে চর্চা, সেটি বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা গণতান্ত্রিক ধারাটাকে ফিরিয়ে আনতে চাই, সুস্থ ধারার রাজনীতিতে দেশকে নিয়ে যেতে চাই। দেশ পরিচালনার জন্য আমরা সেই উদ্যোগই গ্রহণ করেছি।

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ওই সময় সম্ভাবনার জায়গা থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছিল। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল এবং জামায়াত বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছিল। ওই সংসদে জামায়াতের ১৮টি এবং জাতীয় পার্টির ৩৫টি আসন ছিল। অন্য দলগুলোর আসনও ছিল।

তিনি বলেন, ‘সে সময় যদি বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে সবাই মিলে একটা অবস্থান নিতো, তাহলে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একটা সম্ভাবনা থেকে তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা তৈরি হয়েছিল।

তবে ‘এবার বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সেই সম্ভাবনা নেই’ এরপরও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলো ১১ দলীয় ঐক্যÑ সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘এবারও আমরা একটা বিষয় জাতির সামনে আনতে চাই। বিএনপির রাষ্ট্রের সঙ্গে এবং জনগণের সঙ্গে যে দ্বিচারিতা, এটা আমরা জাতির সামনে আনতে চাই।

তিনি বলেন, জুলাই সনদে সবাই মিলে একমত হয়েছিল এবং এ বিষয়ে আদেশও হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গণভোটে জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। কিন্তু সেই রায় বিএনপি বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের আওতায় আসতো। তখন সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন।

তিনি বলেন, একদিকে আপনি সংসদ সদস্যকে ভোটাধিকার দিয়েছেন, আবার তার সেই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছেন। আপনি বলছেন, পাখির মতো স্বাধীন, কিন্তু হাত-পা বাঁধা। আমরা এই জায়গা থেকেই জাতিকে মুক্ত করতে চেয়েছি।

সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য বারবার সংস্কারের কথা বলেছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন-কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করা হলে ১১ দলীয় ঐক্যের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

অলি আহমদের রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার কথা তুলে ধরে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা যাকে প্রার্থী দিয়েছি, তিনি একজন বর্ষীয়ান নেতা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, রণাঙ্গনের সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

রোববার দুপুরে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মিন্টো রোডের বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের নামে ঘোষণা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, চাকরিতে আরও ৯ বছর বাকি থাকলেও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অলি আহমদ রাজনীতিতে আসেন। তিনি চারবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি একজন পিএইচডিধারী, দক্ষ কর্মকর্তা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ, যাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এমন একজন প্রার্থী জাতি আশা করেছে।’

হামিদুর রহমান আযাদের বলেন, সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে অলি আহমদ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারতেন। কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এই সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল ছিল। দুর্ভাগ্য, জাতি এখান থেকে বঞ্চিত হলো। বিএনপির বিচক্ষণতার কারণে অথবা সংস্কারের ব্যাপারে তাদের ইতিবাচক মানসিকতা না থাকার কারণে রাষ্ট্র একজন দক্ষ ও যোগ্য মানুষের সেবা থেকে বঞ্চিত হলো।’

এর আগে গতকাল সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয় থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন ১১ দলীয় ঐকের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি ১১ দলীয় ঐকের পক্ষে অলি আহমদ বীর বিক্রমের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।

এ সময় বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নূরন্নেসা সিদ্দিকা ও মারজিয়া বেগম, এলডিপির প্রতিনিধি বিল্লাল মিয়াজী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা মুফতি ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়সাল এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মোহাম্মদ শহিদুল আলমসহ ১১ দলীয় ঐকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

হামিদুর রহমান আযাদ জানান, অলি আহমদের পক্ষে মনোনয়ন ফরমটি আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১১টায় দাখিল করা হবে।