নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা

সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর ১৩ জন। প্রবাসের কঠিন জীবনেও স্বজনদের জন্য স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় তাদের। সৌদির রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। এই ১৩ জনের সঙ্গে প্রাণ গেছে আরও তিন বাংলাদেশির। তাদের বাড়ি পাশের জেলার নাটোরে।

স্বজন হারিয়ে এখন শোক আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এসব পরিবার। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।

গত রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত সবাই বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করে সেখানে কর্মরত ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মোহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী জানান, রোববার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে কারখানাটিতে আগুন লাগে। আগুনে লাশগুলো পুড়ে যাওয়ায় নিহতদের শনাক্ত করতে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রোববার দিবাগত রাতে জানায়, নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১০ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে এবং তিনজন নাটোরের বাসিন্দা। বাকি তিনজনের পরিচয় জানানো হয়নি। পরে এই তিনজনও নওগাঁর বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

নিহতদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন- আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের মহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০), কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।

এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন- উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।

পরিবার ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সৌদি আরবের রিয়াদে ওই সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন গন্ডগোহালি গ্রামের বাসিন্দা। চার পরিবারই দরিদ্র। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরব পাড়ি জমান তারা। চারজনই ছিলেন অবিবাহিত।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, প্রবাসে থেকে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। কেউ পরিবারের হাল ধরার আশায়, কেউবা নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ আগুনে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

সরেজমিনে উপজেলার গন্ডগোহালি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত¡না দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতেই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে সৌদির আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া নাটোরের তিনজন হলেন- নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়ন শ্রীপুরপাড়া গ্রামের মো. রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন শুভ, দিঘীরপাড় এলাকার মো. জাখের আলীর ছেলে শামীম হোসেন এবং মহিষডাঙ্গা এলাকার আসলাম শেখের ছেলে রবিউল আউয়াল হৃদয়।

বাগমারার লাশ পেতে পরিবারের আহাজারি

বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা

সৌদি আরবে সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬) নামে এক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মৃত কফিল উদ্দিন মাঝির ছেলে। গত রোববার রাতে সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকা-ে তিনি নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকে থামছে না নিহতের পরিবারের আহাজারি। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাদের সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সোমবার সকাল ১১টার দিকে ঘরের এক কোনে বসে ছিলেন নিহতের স্ত্রী রশিদা খাতুন (৪২)। তিনি মাঝে মধ্যে কান্নাকাটি করে চেতনা হারিয়ে ফেলছেন। তিন কন্যা উঠানে বসে অসহায়ের মত কান্না করছিলেন। তিন কন্যার মধ্যে একজন বিবাহিত বাকি দুইজন নাবালিকা।

এদিকে নিহতের পরিবার জানে না কি ভাবে লাশ দেশে আনতে হবে। নিহতের বাসায় গিয়ে দেখা যায় গ্রামের লোকজন, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙখীরা ভিড় করে আছেন। এ সময় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা দ্রুত লাশ দেশে আনার দাবি জানিয়েছেন।

পরিবারের বড় মেয়ে শামিমা জানান, অভাবের তাড়নায় ভাগ্য পরিবর্তনের আসায় বাবা (শ্যামল উদ্দিন মাঝি) ২০১৯ সালে মাঝি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তিনি সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় সোফা তৈরি কারখানায় কাজ করতেন। গত রোববার (৯ আগষ্ট) সোফা কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের বাবা মারা যান। একই কারখানায় পাশের নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আরও কয়েকজন কাজ করতেন। শামিমা পিতার সহকর্মীদের বরাত দিয়ে বলেন, ঘটনার সময় সবাই রুমে ছিলেন। তবে দুইজন ধুমপানের জন্য বাইরে গেলে তারা বেঁচে যায়। অন্যরা আগুনে পুড়ে মারা যায়। পিতার মৃত্যুর সংবাদে অপর মেয়ে নাদিয়া এবারে এসএসসিতে পাশ করছে। পিতার মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। একই ভাবে ছোট মেয়ে জিনিয়া দশম শ্রেণির ছাত্রী বাবাকে হারিয়ে মূর্ছা যাচ্ছেন।

সে নির্বাক হয়ে আছে। বাবা এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বাবার মৃত্যু কিছুতে মেনে নিতে পারছে না। আহাজারিতে সকলের কাছে বাবার লাশ দেশে এনে দাফন করতে সহযোগীতা চাইছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন। পরিবারের লাশ দেশে ফেরত আনতে সার্বিক ভাবে চেষ্টা করবেন তিনি। বিকালে তিনি মরহুমের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে শান্তা ও মরহুমের লাশ দেশে ফেরাত নিতে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিস্ততি দেন। এছাড়া সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা থাকলে তা সহায়তা করতে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।