নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে তার অপরাধ জগতের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের নানা তথ্য। আদালত ফটিকছড়ি থানার একটি হত্যা ও দুটি অস্ত্র আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার পর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অস্ত্রের উৎস, চাঁদাবাজির অর্থের প্রবাহ, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়ে দেশত্যাগের পরিকল্পনা এবং একাধিক হত্যাকা-ে তার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা আফরিন হিমার আদালত ডেভিড ইমনকে ফটিকছড়ি থানার তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই আদেশে তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আরও তিন সহযোগীকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জুনায়েত কাউছার বলেন, ফটিকছড়ি থানার একটি হত্যা ও দুটি অস্ত্র আইনের মামলায় আদালত ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাসহ বিভিন্ন থানায় ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন আগামী সোমবার আদালতে উপস্থাপন করা হবে। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
যশোরে নাটকীয় অভিযান
গত ২৯ জুলাই দিবাগত রাতে যশোরের কোতোয়ালী থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, ডেভিড ইমনকে ধরতে কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা, এরপর পদ্মা সেতু এলাকা হয়ে খুলনার দিকে যান। পরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইল অতিক্রম করে যশোরে পৌঁছান। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েও তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যই এই অভিযানের প্রধান ভিত্তি ছিল।
তদন্তের সূত্র মেলে হত্যা মামলার আসামীর জিজ্ঞাসাবাদে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাউজান থানার মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াসকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ডেভিড ইমনের অবস্থান, সহযোগী এবং অস্ত্রের মজুদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
ধামা ইলিয়াসকে গত ২২ জুলাই গ্রেপ্তারের পর দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি পলাতক সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ২১টি মামলা রয়েছে।
ধামা ইলিয়াসের দেওয়া তথ্য, মোবাইল ফোনের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা নজরদারির সমন্বয়ে ডেভিড ইমনের অবস্থান নিশ্চিত করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিত্যক্ত বাড়িতে অস্ত্রের ভা-ার
ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ভোরে ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
সেখানে একটি বিদেশী পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং আরও কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের ধারণা, এগুলো বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ব্যবহারের জন্য গোপনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করে সাম্প্রতিক কোনো হত্যাকা-ে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ভারত পালানোর প্রস্তুতি?
গ্রেপ্তারের পর সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি হলো ডেভিড ইমনের কাছ থেকে ভারতের একটি আধার কার্ড উদ্ধার।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ওই আধার কার্ডে ডেভিড ইমনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে “আজহার খান” নামে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পুলিশের দাবি, ভারতে অবস্থানরত চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর পরামর্শেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সীমান্তের ওপারে তাকে গ্রহণ করার জন্যও লোকজন প্রস্তুত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এসব তথ্য এখনও তদন্তাধীন এবং যাচাই-বাছাই চলছে।
চাঁদাবাজির অর্থ কোথায় যেত?
তদন্তকারীদের দাবি, ডেভিড ইমন ও পলাতক সন্ত্রাসী রায়হান নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। ডেভিড ইমন নিয়ন্ত্রণ করতেন চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকা, আর রায়হান পরিচালনা করতেন জেলার বিস্তীর্ণ অংশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একজনের এলাকায় অন্যজনের কার্যক্রম পরিচালিত হতো না। চাঁদাবাজির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত সাজ্জাদ আলীর কাছে পাঠানো হতো বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
এছাড়া বিভিন্ন তদবিরকারী ও সহযোগীদের কাছেও অর্থের অংশ পৌঁছে দেওয়া হতো বলে পুলিশের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।
অস্ত্রের উৎস নিয়েও তদন্ত
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ডেভিড ইমনের গ্রুপ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করত।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অস্ত্রের উৎস, সরবরাহ চক্র এবং সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
একাধিক মামলার আসামী
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। এর বাইরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও মহানগরের একাধিক আলোচিত হত্যাকা-ে তার সম্পৃক্ততার বিষয়েও তদন্ত চলছে।
এছাড়া সিএমপির বিভিন্ন থানায় থাকা পাঁচটি মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে তার সহযোগী, অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা না গেলে এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেভিড ইমনের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে নতুন করে আরও কয়েকটি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে অস্ত্রের মজুদ, অর্থের লেনদেন এবং পলাতক সহযোগীদের অবস্থান সম্পর্কে আরও তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করছে পুলিশ।
তবে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার, ভারতে অবস্থানরত সাজ্জাদ আলীর কাছে অর্থ পাঠানো এবং সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর পরিকল্পনার মতো অভিযোগগুলো এখনও তদন্তাধীন। এসব বিষয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে তদন্তের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।