গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে ব্যবহার করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্বকে অরক্ষিত করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের এমপি ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। এদিন র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে তার জেরা শেষ হয়।

ব্যারিস্টার আরমান বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যতদিন সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় থাকবে, ততদিন দেশের সার্বভৌমত্বও সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনা সেই পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। এর মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্বও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। আমরা চাই এ সংস্কৃতি আর ফিরে না আসুক। যত ক্ষমতাধর দলই হোক, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার যেন আর কেউই নষ্ট করতে না পারেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে আরমান বলেন, গুমে থাকাকালীন একেকজনের নির্যাতন একেকরকম ছিল। কিন্তু ভিন্ন থাকলেও বিনা দোষে কোনো মানুষকে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটক রাখা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। যখন এটি ব্যাপক এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে হচ্ছিল, তখন এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে যায়। নির্যাতনের মাত্রার ওপর এই অপরাধ নির্ভর করে না। অপরাধটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে হয়েছিল কিনা, এটাই দেখার বিষয়।

নতুন সরকারের ওপর আস্থা রাখতে চান জানিয়ে এই সাংসদ বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজেও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও গুমের ভুক্তভোগী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যই অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। এই মজলুমদের মিলনমেলার ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। সরকার এই বিচার নিশ্চিত করবে বলেও আমরা আশাবাদী।

শাহ আলী মাজারের হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাজারের মতো ধর্মীয়-গাম্ভীর্য স্থানে হামলার জন্য তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সরকারের দায়িত্ব সব ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ জায়গায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন ভিডিও এভিডেন্স দেখে যদি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তবে ঢালাওভাবে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টদের ঐতিহ্য। আমরা এসবের পুনরাবৃত্তি চাই না।

বেরোবির সাবেক ভিসি হাসিবুর রশিদ কারাগারে : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশিদকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেনÑ বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি সাজা পরোয়ানা মূলে হাসিবুর রশিদকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।

এর আগে, গত ৯ এপ্রিল শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল-২। ওই রায়ে সাবেক ভিসি হাসিবুর রশিদকে ১০ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। শনিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড এলাকায় হাসিবুর রশিদের অবস্থান টের পেয়ে তাকে আটকে রাখেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। গতকাল তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আদালত এই আদেশ দেন।

আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন বেরোবির দ-িত সাবেক ভিসি হাসিবুর রশিদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ-িত রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশিদের উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।

গতকাল ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।

তিনি বলেন, গত ৯ এপ্রিল শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল-২। এ মামলায় ১০ বছরের সাজা পেয়েছেন বেরোবির তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশিদ। তবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের পর তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। আমরা সাজা পরোয়ানামূলে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর আবেদন করি। আদালত তা মঞ্জুর করে হাসিবুর রশিদকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

আপিলের সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে প্রসিকিউটর ফারুক বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনও প্রকাশ হয়নি। তাই রায় পাওয়া সাপেক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন হাসিবুর রশিদ। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তিনি এটি করতে পারবেন। তবে উচ্চ আদালতেও তার এ সাজা বহাল থাকবে বলে আমরা আশা করছি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার এই হত্যাকা- তৎকালীন ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছিল।