জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, ৪৭ আমাদের ভিত, ৭১ আমাদের অহংকার এবং ২৪ আমাদের পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পেলেও দেশ ও জনগণ ভালো নেই। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, খুন, চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর সরকার ব্যস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলকানাদের বসাতে। তারা জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। প্রায় ৭০ শতাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দাতাদের অপমান করে তারা ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে। এতে জনগণ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। এর ফল তাদেরকেই বহন করতে হবে। স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসনের ইচ্ছা থাকলে পরিণতির জন্যও ভাবতে হবে। জুলাই বারবার ফিরে আসবে। আমরা আর কোনো মূল্যবান জীবন হারাতে চাই না।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল ৫টায় সিলেট মহানগর জামায়াত আয়োজিত নগরীর শাহী ঈদগাহস্থ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেন।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে ৫টি ব্যাংক নিয়ে সমন্বিত ব্যাংক করা হয়েছিল। সেই ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকার জন্য ঘুরছেন, কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ নেই। সরকার সমৃদ্ধ ইসলামী ব্যাংক দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতের অন্ধকারে জুম মিটিং করে ইসলামী ব্যাংক দখলের বন্দোবস্ত হচ্ছে। এক মাসের মাথায় আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, তাও রাতের আধারে। এটাও কি রাতের সরকার?— এমন প্রশ্ন জনগণ করতে পারে। পলাতক, ফ্যাসিস্ট ও লুটপাটকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নরকে জোর-জবরদস্তি করে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসানোর ফলাফল ভালো হবে না। যে গ্রাহকের ৫টি শেয়ার আছে, সেও ইসলামী ব্যাংকের একজন মালিক। সুতরাং একটি সমৃদ্ধ ব্যাংক দখল হয়ে গেলে গ্রাহকরা বসে থাকবেন না। এজন্য গ্রাহক হিসেবে আমাকেও রাজপথে নামতে হতে পারে।
জামায়াতের আমীর বলেন, ভোটের আগে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালালেন। এখন বলেন, নির্বাচন যদি না দেয়, সেই ভাবনা থেকে গণভোট মেনে নিয়েছিলাম। এটি জনগণের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা। তারা ইতোমধ্যে প্রতারণার ফলাফল পেতে শুরু করেছেন। একটি সরকারের তিন মাসের মাথায় মন্ত্রীদের ভুয়া স্লোগান শুনতে হচ্ছে। অথচ আমরা মনে কষ্ট নিয়েও নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম। আবার সরকারের জ্ঞানী মন্ত্রীরা বলেন, সংবিধানে গণভোট নেই। গণভোট নাকি অবৈধ। তাহলে শহীদ জিয়া কীভাবে গণভোট করেছিলেন, এর উত্তর তাদের কাছে নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে আদেশে জাতীয় নির্বাচন হলো, সেই একই আদেশে গণভোট হলো। তাহলে একটি বৈধ আর একটি অবৈধ হয় কীভাবে? এটা প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণকে অপমান করার শামিল। জনগণকে যারা অপমান করে, জনগণও তাদের ছেড়ে দেয় না। আমরা মনে কষ্ট নিয়েও জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো ছাড় দেব না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদের ভেতরে ও বাইরে লড়াই চালিয়ে যাব। লড়াই থামবে না। একজন দলকানা ঋণখেলাপি গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। এমন নজির বিশ্বের কোথাও নেই।
তিনি বলেন, সরকার ভালো করলে সহযোগিতা করব, মন্দ করলে প্রতিবাদ করব, বাধা দেব। নীরব বসে থাকব না। জ্বালানি সংকট নিয়ে আমরা সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী-এমপিগণ তেলের মজুদ নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও আশ্বাসমূলক বক্তব্য দিয়ে জনগণের কাছে হাসির পাত্র হয়েছেন। উল্টো তারা জামায়াতকে দোষারোপ করতে শুরু করলেন। এখানেও ষড়যন্ত্র খুঁজতে থাকলেন। তারা জনগণকে চোর বানাতে লাগলেন। তখন আমরা বললাম, যেহেতু বিরোধী দল সম্পৃক্ত, তাহলে আর কেউ চুরি করে মজুদ করতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকের চেয়ারে দলকানাদের বসিয়ে তারা ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন। ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে পতনের ছিদ্র কিন্তু খোলা থাকবেই। জুলাই থেকে শিক্ষা না নিলে এটা দুর্ভাগ্য। আমরা সংসদে গালাগালি ও কারও চরিত্রহনন করতে বাধা দিয়েছি। সংসদে কেউ আর গালমন্দ করে না। রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের জন্য সরকারকেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সুধী সমাজকে জামায়াতে যোগদানের আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান।
বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন— সিলেট অঞ্চল টিম সদস্য হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, মহানগর নায়েবে আমীর হাফিজ মাওলানা মিফতাহুদ্দীন ও ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, মহানগর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রব, জাহেদুর রহমান চৌধুরী ও মাওলানা ইসলাম উদ্দিন, বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট আলিম উদ্দিন, মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জামিল আহমদ রাজু এবং মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজু প্রমুখ। শুরুতেই পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মাওলানা মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই শহীদ ও আহতদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে জামায়াতে ইসলামী কাজ চালিয়ে যাবে। সরকারকে নব্য ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরে আসতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। জামায়াত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদে ও রাজপথে থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি মজলুম দল। জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আমরা আছি, আর ষড়যন্ত্রকারীরা পরাজিত হয়েছে, পালিয়ে গেছে। তাই এ দেশে কারও ওপর কোনো জুলুম মেনে নেব না। ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।