মো. আসিফ সিদ্দিকী
একসময় বঙ্গোপসাগরকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় এ উপসাগর আর শুধু মাছ, বন্দর বা সমুদ্রপথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), ভারতের ঝঅএঅজ SAGAR
(Security and Growth for All in the Region) নীতি, জাপানের মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (FOIP) ধারণা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইন্দো-প্যাসিফিক সম্পৃক্ততাÑসব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নতুন এক কৌশলগত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এ প্রতিযোগিতার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সংযোগের কারণে বাংলাদেশ আজ আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; বরং এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক “Geopolitical Crossroads” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একদিকে ভারত, অন্যদিকে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর-এ অবস্থান বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহন সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয় এবং ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর সেই বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি, পূর্ব এশিয়ার শিল্প, দক্ষিণ এশিয়ার বাজার এবং আফ্রিকার বাণিজ্যিক সংযোগের একটি বড় অংশ এই সামুদ্রিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ অঞ্চলে যে রাষ্ট্র প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, সে শুধু সামরিক নয়; অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবেও বাড়তি সুবিধা অর্জন করবে।
এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই চীন গত এক দশকে বাংলাদেশে বড় আকারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছে। কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নকে নতুন গতি দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। জাপান মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে এক ধরনের “Strategic Competition” তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শক্তি নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করতে চায়।
এ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও। ইতিবাচক দিক হলোÑবৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ছে, অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের সামনে ব্লু ইকোনমি বিকাশেরও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, অফশোর গ্যাস, সমুদ্রভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক পর্যটন এবং গভীর সমুদ্র গবেষণা আগামী কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু এ সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ কূটনীতি, উন্নত প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
অন্যদিকে ঝুঁকিও কম নয়। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষের চাপের মুখোমুখি হতে হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অন্য রাষ্ট্রের অসন্তোষের কারণ হতে পারে। বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থনৈতিক টেকসইতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত মহাসাগর বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যদি সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তাহলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাহাজ চলাচল এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর পড়বে। তাই কেবল উন্নয়ন সহযোগিতা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”-আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এ নীতিকে আরও বাস্তববাদীভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কেবল নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিলেই হবে না; বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়। বহুমুখী কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
আজকের বিশ্বে যুদ্ধের ধরনও বদলে গেছে। এখন কেবল সামরিক শক্তি নয়; বন্দর, জ্বালানি, প্রযুক্তি, সাপ্লাই চেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং বিরল খনিজ সম্পদের ওপরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে শুধু একটি ভোক্তা রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের আধুনিকায়ন, ব্লু ইকোনমিতে গবেষণা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ এ প্রতিযোগিতাকে উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করতে পারে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় ক্ষয় এবং লবণাক্ততার বিস্তার শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এগুলো ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জলবায়ু কূটনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলোÑভূ-রাজনীতি কখনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে রাষ্ট্র নিজের কৌশল নির্ধারণ করতে পারে না, অন্যরা তার কৌশল নির্ধারণ করে দেয়। তাই বাংলাদেশকে আবেগ নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী হলো জাতীয় স্বার্থ। সে স্বার্থকে কেন্দ্র করেই অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আগামী এক দশকে আরও তীব্র হবে-এটি প্রায় নিশ্চিত। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য সংকটও বয়ে আনতে পারে, আবার অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে। সিদ্ধান্ত এখন বাংলাদেশের। আমরা কি কেবল শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার দর্শক হয়ে থাকব, নাকি বিচক্ষণ কূটনীতি, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করব? এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত ভবিষ্যৎ। একটি বিষয় স্পষ্টÑবঙ্গোপসাগরের নতুন ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো পরাশক্তি নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হবে একটি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মবিশ্বাসী এবং দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি।
লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।