রাজনীতির পথচলাটা সর্বসাম্প্রতিক নয়; বরং প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গণমানুষের কল্যাণ। আগের দিনে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন একশ্রেণির নিবেদিত প্রাণ ও মানবতাবাদী মানুষ। তাদের ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিলো মানুষের কল্যাণ ও মুক্তিকে কেন্দ্র করে। এক সময় বিত্তশালী মানুষেরা রাজনীতি করতে এসে ফতুর হয়ে যেতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখনকার দিনের একশ্রেণির রাজনীতিক অগাধ অর্থবিত্তের মালিক। দেশে অর্থ সংরক্ষণের সংকুলান না হওয়ায় বিদেশে বেগম পাড়া বানানোর রেকর্ড রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। রাজনীতি এখন একশ্রেণির স্বার্থান্ধ মানুষের আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, শ্রেণিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে সৎ, যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ ও প্রজ্ঞাবান মানুষের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। যারা এখনো কোনভাবে মাথাগুঁজে রয়েছেন তারা রীতিমত কোনঠাসা। নিয়ন্ত্রণটা তাদের হাতে নেই। ফলে রাজনীতি হারাতে বসেছে গণমুখী ও কল্যাণকামী চরিত্র।
বস্তুত, রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি হলো দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি। রাজনীতির একাডেমিক অধ্যয়নকে রাজনীতিবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ হলো রাজনীতি নিয়ে গবেষণা। বস্তুত, রাজনীতি একটি বহুমুখী শব্দ। এটি আপসের ও অহিংস রাজনৈতিক সমাধান প্রসঙ্গে ইতিবাচক অর্থে, অথবা সরকার বিষয়ক বিজ্ঞান বা কলা হিসেবে বিশদভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। পাশাপাশি এটি ‘দুরভিসন্ধি’ বিষয়ক একটি নেতিবাচক অর্থও বহন করে। রাজনীতিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পরিসরে মৌলিকভাবে এবিষয় নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে। যেমন, এটি কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, বিস্তৃতভাবে নাকি সীমিতভাবে; রাজকীয়ভাবে নাকি সাধারণভাবে এবং কোনটি এক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী; সংঘাত নাকি সমঝোতা-এসব নিয়েই রয়েছে নানা আলোচনা। কিন্তু এসব নিয়ে রাষ্ট্রচিন্তক মধ্যে ঐক্যমত হয়নি।
রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে কারও নিজস্ব রাজনৈতিক অভিমত মানুষের মাঝে প্রচার করা; অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময়, আইনপ্রণয়ন এবং বলপ্রয়োগের চর্চা; যার মধ্যে রয়েছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা লড়াই। একথা ঠিক যে, সামাজিক বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত পরিসরে রাজনীতির চর্চা করা হয়, ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থায় গোত্র ও গোষ্ঠী থেকে শুরু করে আধুনিক স্থানীয় সরকার, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত। আধুনিক জাতি রাষ্ট্রে মানুষ প্রায়ই নিজস্ব মতবাদ তুলে ধরতে রাজনৈতিক দল গঠন করে। কোন দলের সদস্যগণ প্রায়শই বিভিন্ন বিষয়ে সহাবস্থানের ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ এবং আইনের একই পরিবর্তন ও একই নেতার প্রতি সমর্থনে একাত্ম হয়। এক্ষেত্রে নির্বাচন হল সাধারণত বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন যুগে; যেখানে প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের রাজনীতি, চাণক্যর অর্থশাস্ত্র ও চাণক্য নীতি (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) এবং কনফুসিয়াসের লেখার ন্যায় দিগন্ত উন্মোচনকারী কাজগুলো বিধৃত হয়েছে।
সর্বোপরি রাজনীতি হলো সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নাগরিক জীবনের সকল সমস্যার সমাধান; সম্পদের সুষম বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। রাজনীতিক হলেন সে ব্যক্তি, যিনি প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় বা দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করেন। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায়, এটি এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ, শাসন গঠন এবং অভ্যন্তরীণ-বাহ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাজনীতিকের মূল কাজ হলো, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, বিচারব্যবস্থা ও শাসনতন্ত্র পরিচালনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে রাজনীতি এখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
প্রাচীন কাল থেকেই রাজনীতি মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ এরিস্টটল বা চাণক্যের মতো দার্শনিকদের হাত ধরে এর তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে ওঠেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এরা সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত বা নিযুক্ত হন। জনগণের দাবি বিবেচনা করা, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, বাজেট বরাদ্দ ও জনকল্যাণমুখী নীতি প্রস্তাব করা। আইন, সমাজকর্ম বা দলীয় সংগঠনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা ব্যক্তিরা সাধারণত রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।
রাজনীতিক হলেন সে ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। সাধারণভাবে এরা রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনীতিজ্ঞ হিসেবে পরিচিত; যারা দলীয় আদর্শ ও জনকল্যাণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে থাকেন। সাধারণ মানুষের দাবি, অভাব-অভিযোগ ও সমস্যা সংসদে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরেন। রষ্ট্রীয় সংবিধান অনুযায়ী নতুন আইন তৈরি বা বিদ্যমান আইনের সংশোধন করা। নির্বাচন ও দলীয় সমর্থনের মাধ্যমে শাসনভার গ্রহণ ও দেশ পরিচালনা করা। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এটি মূলত বিশেষ্য (Noun) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে (রাজনীতিবিদ) নির্দেশ করে। এটি বিশেষণ (Adjective) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা রাজনীতি-সংক্রান্ত কোনো বিষয় বা ধারণাকে বোঝায়।
রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্যদের সম্মিলিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মানব লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে সাহায্য করা। এটি ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সংরক্ষণ করে। রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, নাগরিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধ দমন করা এবং সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক বণ্টন ও পরিচালনা করা। মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোর সুরক্ষা ও চর্চা নিশ্চিত করা। প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজের পরিচালনা ও উন্নতির জন্য রাজনীতি একটি মৌলিক প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে আসছে।
মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ক্ষমতার বন্টন, নীতি নির্ধারণ এবং সমাজ পরিচালনার মাধ্যম হিসেবে রাজনীতির উদ্ভব ঘটেছে বলে ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা রাজনীতির জনক বলা হয়। এটি মূলত আদিম গোত্রীয় সমাজ থেকে শুরু হয়ে রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিক শাসন এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিবর্তিত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে এথেন্সে প্রথম প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়। পরবর্তীতে রোমান সাম্রাজ্য আইন ও প্রজাতন্ত্রের ধারণার ভিত্তি স্থাপন করে। মধ্যযুগে অধিকাংশ সমাজ রাজা, সম্রাট বা ধর্মীয় যাজকদের দ্বারা পরিচালিত হতো। ১৫শ’ শতক থেকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’ এ তিনটি মূলনীতির মাধ্যমে বিশ্বে আধুনিক গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের জোয়ার নিয়ে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজতন্ত্রের পতন ঘটতে থাকে এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উত্থান হয়। বিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে আদর্শিক লড়াই বৈশ্বিক রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনকালে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির পর, বাঙালিরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে সামরিক শাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, সেকালের রাজনীতির সাথে একালের রাজনীতির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। নেপথ্যে রয়েছেন একশ্রেণির রাজনীতিকরাই। আগের দিনে রাজনীতিকরা রাজনীতি করতেন মানবসেবার জন্য। কিন্তু সে অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে একশ্রেণির স্বার্থান্ধ ও সুযোগ সন্ধানী মানুষের। রাজনীতির ময়দান এখন এদেরই অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিতে ভালো মানুষের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ না থাকলেও অসৎদের প্রবল্যে এরা এখন রীতিমত অসহায়। ফলে একথা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এর কক্ষচ্যুতির বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। মূলত, রাজনীতির মাঠ এখন একশ্রেণির ক্ষমতালিপ্সু মানুষের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আগের দিনে পারিবারিক ও সমাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পারস্পরিক সমঝোতার প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিকরা কাজ করলেও এখন শ্রেণি বিশেষ রীতিমত মধ্যস্বত্ত্বভোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অতীতের রাজনীতিকরা ছিলেন গণমানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয় স্থল। যেকোন সমস্যা সমাধানের জন্য তারা ছুটে যেতেন রাজনীতিকদের কাছে। একটা গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক সমাধানের আশায়। কিন্তু সঙ্গত কারণে সাধারণ মানুষের সে আস্থায় ফাটল ধরেছে। এসব রাজনীতিকরা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থকে মূখ্য; আর গৌণ হিসাবে বিবেচিত অধিকার বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ। ফলে আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনীতি হারাতে বসেছে কল্যাণমুখীতা।
দু’একটি ঘটনার উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। জেলখানায় জেলখানায় সাক্ষাৎ হয়েছিলো এক ছাত্রনেতার সাথে। সে আমার পাশেই ঘুমাতো। ‘আ’ আদ্যাক্ষরে নাম ছাত্রনেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার মামলার কথা। তার উচ্ছসিত জবাব ছিলো ‘ছিনতাই’। একথা বলার পর সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলো। আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রমূলক বা রাজনৈতিক মামলা। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘অভিযোগ সত্য কি না’ ? সে আমার কাছে অবলীলায় স্বীকার করে বললো, ‘হ্যাঁ অভিযোগ সত্য’। এবারও তার মুখে সশব্দে হাসি লক্ষ্য করলাম। মনে হয় সে এক মহান কাজ করে জেলে এসেছে।
সে গর্ব করেই আমার কাছে আত্মস্বীকৃতি দিয়ে জানিয়েছিলো, এক মোটরসাইল আরোহীর কাছ থেকে সে তার বন্ধুদের সহযোগিতায় ২০ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়েছে। ভিকটিমরা অভিযোগ করেছিলেন এক বর্ষীয়ান স্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতার কাছে। দলনেতা তাকে ঢেকে নিয়ে বলেছিলেন টাকাটা মালিককে ফেরৎ দিতে। তার এমন নির্দেশনার যুক্তি হলো ভিকটিমরা তাকে চিনতে পেরেছে। চিনতে না পারলে তিনি হয়তো এ বিষয়ে কোন কথাই বলতেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে বলা হয়েছিলো টাকা ফেরৎ না দিলে তার সমস্যা হবে। এরপর পুলিশ পাঠিয়ে তাকে আটক করা হয়েছিলো। এ বিষয়ে ছিনতাইকারী ছাত্রনেতার আত্মপক্ষ হলো, ২০ লাখ টাকা ফেরতের কোন সুযোগ নেই। এজন্য হয়তো তাকে মাস তিনেক জেলে থাকতে হবে। বিচারে কিছুই হবে না। কেউ তার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দেওয়ার সাহস করবে না। আর তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে নেতাও হয়েছেন দায়মুক্ত। কারণ, তিনি ভিকটিমকে বলতে পারবেন তিনি তার দলীয় লোকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
একশ্রেণির রাজনীতিক রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণায় লিপ্ত হচ্ছেন এটা নিয়ে তেমন কোন বিতর্ক নেই। একদিন একজন সিনিয়র রাজনীতিকের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছিলেন। ফোনটা বেজে উঠেছিল তখনই। উভয় পক্ষের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো, ‘স্যার আমার আওতা দুই। আপনি সুপারিশ করেছেন ১৭ জনের পক্ষে’। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক একগাল হেসে দিয়ে প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আরে মিয়া আমি জনপ্রতিনিধি। যে আসে তারেই লিখে দিই, ‘Strongly recommended for favourable consideration’ সিদ্ধান্ত তো নিতে হবে আপনাকেই। আমি তার কথায় হতভম্ব ও বিচলিত না হয়ে পারিনি।
একদিন আমার এক বন্ধু আমার কাছে এক চমকপ্রদ গল্প শুনিয়ে ছিলেন। তার বাবা এক শীর্ষ রাজনীতিকে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একদিন জমির সীমানা বিতর্কে প্রতিবেশীদের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়েছিলো। প্রতিবেশীদের দ্বারা প্রহৃত হয়ে তার বাবা বর্ষীয়ান রাজনীতিকের কাছে বিচার নিয়ে এসেছিলেন। বয়োবৃদ্ধ এ রাজনীতিক একতরফা ঘটনার বিবরণ শুনে ক্ষুব্ধ হওয়ার ভান করে ওসির কাছে ফোন দিয়ে অভিযুক্তদের কোমরে রশি বেধে ধরে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশও যথারীতি পালিত হয়েছিলো। এরপর নালিশ নিয়ে এসেছিলো অপর পক্ষ। তিনি তাদের কাছে বিষয়টি না জানার ভান করে থানায় ফোন করে ওসি সাহেবকে বলেছিলেন ‘ওদের ছেড়ে দেন। বিষয়টা আমি দেখছি’। বিষয়টি এখানেই শেষ হয়েছিলো। পরবর্তীতে তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।
মূলত, এভাবেই চলছে আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিকের রাজনীতির নামে অপরাজনীতি। তারা মানুষের সমস্যার সমাধান বা কল্যাণে কাজ না করে সকল শ্রেণির মানুষের মনোতুষ্টি ও ভোট নেওয়ার জন্য অনৈতিক ও জনগণের সাথে প্রতারণা করতে কসুর করছেন না। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জুলাই বিপ্লব ও সনদ নিয়ে সরকারি দলের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে। বর্তমান সরকার, বিরোধী দল ও সংসদ জুলাই বিপ্লবের ফলশ্রুতি হলেও সরকারি দল তা মানতে চাচ্ছে না বরং তারা জুলাই সনদকে ‘প্রতারণা’ বলে রীতিমত অস্বীকার করে বসেছে। অথচ তারা জুলাই সনদে স্বতোঃপ্রণোদিত হয়েই স্বাক্ষর করেছিলো। আবার তারা মাঝে মধ্যেই বলছেন, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। রাজনীতিতে এমন স্ববিরোধীতা ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব কোন ভাবেই কাম্য নয়। এটিই হচ্ছে রাজনীতিতে একাল ও সেকালের পার্থক্য।
এমতাবস্থায় দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের অবশ্যই আত্মসমালোচনা করতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে অপরাজনীতি এবং আত্মপ্রতারণার অশুভ ও নেতিবাচক বৃত্ত থেকে। কারণ, রাজনীতি ও রাজনীতিকরাই জনগণের ভাগ্য নিয়ন্তা। তাই সংশ্লিষ্টদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। কক্ষচ্যুত রাজনীতিকে ফিরে আনতে হবে আসন কক্ষে। অন্যথায় আমাদের আগামী দিনের পথচলা মোটেই সুখকর হবে না।
www.syedmasud.com