মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ভাষা। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিকাশে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষা মানুষের তৈরি কোনো কৃত্রিম বস্তু নয়; বরং মহান আরশের মালিকের পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অনন্য উপহার। সভ্যতার বিকাশ, জ্ঞানচর্চা এবং পারস্পরিক যোগাযোগের মূল ভিত্তি হলো ভাষা। এককথায়, ভাষা ছাড়া মানুষের জীবন ও সমাজব্যবস্থা অচল। বাংলাদেশের ইতিহাসে বাংলা ভাষার গুরুত্ব আরও গভীর, কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম ভাষার জন্যই মানুষ জীবন দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ভাষার স্বীকৃতির সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষার আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলা আজ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূণ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সাত দশক পেরিয়ে গেলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বার বার সামনে আসছে- আমরা কি সত্যিই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সচেতন? নাকি ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের আনুষ্ঠানিকতা ও স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? বর্তমান সময়ে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমার বিষয়টিই ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা মাধ্যমের প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, যা বর্তমান সময়ে এসে বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এবং বিশেষ করে ২০০০ সালের পর ইংলিশ ভার্সন ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। একই সময়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তির খাত, বেসরকারি ব্যাংকিং এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে ইংরেজি দক্ষতার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক অভিভাবকের মধ্যে এই ধারণা জন্ম নেয় যে, সন্তানের উজ্জ¦ল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে ইংরেজি মাধ্যমেই পড়াশোনা করাতে হবে। তবে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক যোগাযোগের বড় অংশই ইংরেজি নির্ভর। তাই ইংরেজি শেখা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বর্তমান যুগের একটি অপরিহার্য দক্ষতা। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ইংরেজি শেখাকে মাতৃভাষার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। অথচ একজন মানুষের পরিচয়ের মূল ভিত্তি হচ্ছে তার ভাষা। যে ব্যক্তি নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয় না, তার পক্ষে বিশ্বের দরবারে নিজের জাতিসত্তাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করাও সম্ভব হয় না। বর্তমান সমাজে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এই ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের পূর্বসূরিরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। সংবাদপত্রের পাতায় যখন শিরোনাম হয়- ‘বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনীহা বাড়ছে’, তখন হয়তো বিষয়টি সবাইকে সমানভাবে আলোড়িত করে না; কিন্তু সচেতন প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলা এমন এক অনন্য ভাষা, যার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে মানুষ জীবন দিয়েছে। তাই বাংলা ভাষার গৌরব, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে বর্তমান যুগে সন্তান ইংরেজি, বাংলা, আরবি কিংবা জাপানি-যে মাধ্যমেই পড়াশোনা করুক না কেন, তার আচরণে যেন মাতৃভাষার প্রতি কোনো অবহেলা, হীনমন্যতা বা অসৌজন্য প্রকাশ না পায় সে বিষয়ে অভিভাবকদের সর্বদা সজাগ থাকা প্রয়োজন। মধ্যযুগে যখন সাধারণ মানুষের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আবদুল হাকিম অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বাংলার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত ‘বঙ্গবাণী’ কবিতার সেই অমর পঙক্তি- ‘‘যাহারা বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’’ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলা ভাষা ও স্বদেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, আত্মমর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল এই কবিতা। ইংরেজি ভাষা শেখা কোনো অপরাধ নয় ; বরং বর্তমান বিশ্বে এটি একটি প্রয়োজনীয় দক্ষতা। তবে নিজের মাতৃভাষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া আরও বেশি প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে আমাদের যেসব সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে, তাদের একটি অংশ বাংলা ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে কিংবা শুদ্ধভাবে লিখতে পারছে না। অন্যদিকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত ইংরেজি অধ্যায় করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইংরেজি বলা ও লেখার দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। অর্থাৎ এই সংকটটি শুধু বাংলা বা ইংরেজি মাধ্যমের দ্বন্দ্ব নয়; বরং কার্যকর ভাষা শিক্ষার সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্যেই নিহিত। এই সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়।

আমাদের সন্তানরা দীর্ঘদিন ইংরেজি অধ্যয়ন করেও কেন ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, সে বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী এখন বাংলা পাঠও সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার ‘রতনদিয়া রজনীকান্ত সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’ এ আকস্মিক পরিদর্শনে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন। পরিদর্শনের সময় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থী সঠিকভাবে বাংলা ও ইংরেজি রিডিং পড়তে না পারায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশের বহু বিদ্যালয়েই আজ একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। এমন বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জম্ম দেয়। শিক্ষার্থীরা কেন বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, তার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। শুধু ভাষার মাধ্যম নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসের সংকট নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। অন্যথায় আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করব, যারা মাতৃভাষায়ও দক্ষ হবে না, আবার আন্তর্জাতিক ভাষাতেও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি শিক্ষার মান বাড়ানো এখনো সময়ে দাবি। শুধু ব্যাকরণ মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাস্তব জীবনে ইংরেজি বলা, লেখা, শোনা ও বোঝার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর ভাষানীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইংরেজি কোনো আভিজাত্যের প্রতীক নয়; এটি কেবল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান অর্জন এবং পেশাগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই মানসিকতা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমাদের সন্তানরা একদিকে যেমন বাংলায় দক্ষ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে, অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করার মতো ইংরেজি দক্ষতাও অর্জন করবে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইংরেজি মাধ্যম ও বিদেশি পাঠ্যক্রমের প্রতি অভিভাবকদের অতিরিক্ত ঝোঁকের কারণে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। ও-লেভেল, এ-লেভেল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কারিকুলামের ওপর অতিনির্ভরশীলতার ফলে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফি, পরীক্ষার ফি এবং বিদেশি পাঠ্যপুস্তক ক্রয়ের বিপুল অর্থ সরাসরি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষা বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। একই সঙ্গে অনেক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদেশি ব্র্যান্ড বা কারিকুলাম ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রয়্যালটি বিদেশে প্রেরণ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব খাতে প্রতি বছর আনুমানিক প্রায় সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার ও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে সংকট এখানেই শেষ নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় অতিক্রম করার পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমায়। ফলে শুধু টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাবদই বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষালাভের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেন এখনো এমন মানে উন্নীত হতে পারেনি, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারে? শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই প্রতি বছর দেশের মেধা ও সম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশমুখী হচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের বুঝতে হবে, শিক্ষার মান কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা কারিকুলামের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। দ্বিতীয়ত, দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সুসংহত, বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি ভাষানীতির আওতায় এনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলা ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে ইংরেজিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সুতরাং, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং এ দুয়ের সুষম সমন্বয়ই আগামী বাংলাদেশের মূল শক্তি। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত চেতনা কেবল ফেব্রুয়ারির আবেগে বা শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল ভিত্তি হলো এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা মাতৃভাষায় দক্ষ হবে এবং একই সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগের ভাষা আয়ত্ত করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে শুদ্ধ বাংলা চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। বাংলা ভাষার শিকড়কে হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে যখন আমরা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুয়ারে পা রাখব তখনই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে এবং সুরক্ষিত হবে আমাদের জাতীয় পরিচয়।