মাহবুবুল হক

দেশ-বিদেশের সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ভারতের বুকার পুরস্কার জয়ী প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজ বিশ্লেষক অরুন্ধতি রায় গত ৩ আগস্ট দিল্লীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বেস গিটারিস্ট গায়ক হতে পারেন না, গায়ক ড্রামার হতে পারেন না, ড্রামার গিটারিস্ট হতে পারেন না।

কথাটি শাশ্বত-চিরকালীন। মহান আল্লাহতায়ালা যখন দুনিয়ার প্রথম মানুষ আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করলেন তখন তিনি ফেরেশতাদের সামান্য প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তারা কিছু কথা রেখেছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালাও তার নেয়ামত, রহমত ও করুণার দৃষ্টি দিয়ে ফ্রেশ মোলায়েম স্বরে বলেছিলেন, আমি যা জানি তোমরা তা জান না। তারপর তিনি কিছু জিনিসের নাম বলতে বলেছেন। ফেরেশতারা বিনয়াবনত আবহে বলেছিলেন, হে মহান সৃষ্টিকর্তা আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন, এর বাইরে তো আমরা কিছু জানি না। তখন মহান আল্লাহতায়ালা আদম (আ:)-কে বললেন, তুমি বল। আদম (আ:) আদেশমত কিছু নাম বলতে থাকলেন। ফেরেশতারা অবাক হয়ে থাকলো। স্তম্বিত হয়ে গেল। মহান আল্লাহতায়ালা তখন ফেরেশতাদের বললেন, তোমরা আমার এই সৃষ্টিকে কুর্নিশ করো।

বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রথম এ ঘটনাটিকে আমরা খুব-বেশী একটা বিশ্লেষণ করি না। চিন্তা-ভাবনাও করি না। এটা নিয়ে আলোচনা, ও মতবিনিময় করার তাগিদ আমরা অনুভর করি নি। আমরা এ অত্যাশ্চর্য ঘটনা থেকে কালের পর কাল থেকে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা বলে বিশ্লেষণ না করে, ইসলামের ধর্মীয় ঘটনা বলে উল্লেখ করে এসেছি। অন্য ধর্মের মানুষ এই ঘটনাটিকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করে নি।

আমরা যদি এ বিষয়টিকে সুক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করি তাহলে খুব সহজভাবে বলা যায়, মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে সে কাজের উপযুক্ত হবার জন্য ইনবিল্ড মেধা, আকল, বুদ্ধি, বিবেচনা দিয়ে রেখেছেন। বাড়তি হিসেবে মানুষের মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি পুশ করে রেখেছেন। ফেরেশতাদেরকে তিনি যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন তারা যেন সর্বোত্তমভাবে সে কাজটি সম্পন্ন করতে পারে। সেই মেধা-জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা তাদেরকে তিনি দিয়ে রেখেছেন, এর বাইরে তারা আর কিছু করতে পারতো না বা পারে নি।

শুরুতে সে কথা আমরা উদ্ধৃত করেছি। মহান আল্লাহ মাটির মানুষ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে তারমধ্যে আকল-জ্ঞান-বিদ্যা-বুদ্ধি-বিবেচনা-বিবেকসহ আরও বহু কিছু এমনভাবে পুশ করেছেন যার ফলে জিজ্ঞাসিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি জবাব দিতে পেরেছেন।

একইভাবে প্রতিটি মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালা আকল-জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা-অনুসন্ধিৎসা-কৌতুহল (ইব্রাহিম আ.), সংগঠন শক্তি (নূহ আ.), অন্বেষা-বিতর্ক (মুসা আ.), সমর্পণ (ইউনূস আ.), তাকওয়া ও রাষ্ট্র পরিচালনা (ইউসুফ আ.), ধৈর্য ও শোকর-সবর (ইসহাক আ.), দুঃখ-কষ্ট বহন করার শক্তি (আইয়ুব আ.), নিরাপত্তাবোধ-আত্মরক্ষা-সমরচেতনা-আত্মগঠন (দাউদ আ.), অন্তরদৃষ্টি-সৃষ্টির সংগে সংযোগ-নগর চেতনা (সোলায়মান (আ.), বিনয়-নম্রতা-সেবা-শুশ্রূষা-মমতা-ভালবাসা (ইসা আ.) এবং সবশেষ নবী ও রসুল মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বগুণে গুণান্বিত শ্রেষ্ঠতম মানুষে পরিণত করেছেন। যা শুধু মুসলিমরা নয় সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া দুনিয়ার সকল মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে স্মরণ করছে। আশাকরা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত এই অনুরাগ বিজয়ের পর্যায়ে অবস্থান করবে।

আমরা বিশ্বাস করি বা না করি নবী-রসুলরাই হলেন, মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠতর মানুষ-মানবিক স্বত্ত্বা। আল্লাহতায়ালা যাঁকে দিয়ে যে কাজ করাতে চেয়েছেন তাঁকে সে গুণসমূহ প্রদান করে অর্থাৎ কর্মের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এটা এমন নয় যে, মানুষকে আল্লাহর পথে বা আল্লাহর দিকে আনার জন্য বা প্রত্যার্পণের জন্য মনুষ্য জাতির মধ্যে উপযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য মানুষ খুঁজে বেড়িয়েছেন বা তিনি দুনিয়াতে ফেরেশতা পাঠিয়ে তার কাক্সিক্ষত নেতৃত্বপ্রদানকারী মানুষটিকে খোঁজার অবকাশ সৃষ্টি করেছেন।

ইসলামের বিধান মতে, মহান আল্লাহতায়ালা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নবী ও রসুলদেরকেও পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তিনি সুদূর প্রসারি পরিকল্পক। তাকে চিন্তা-ভাবনা, জ্ঞান-গবেষণা করতে হয় না। জ্ঞান আহরণ করতে হয় না। শিক্ষাগ্রহণ করতে হয় না ‘হি নোজ এভরিথিং’। তাঁর কাছে অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলে কোনো কাল বা সময় নেই। অলওয়েজ বর্তমানকাল।

মুমিন ছাড়া মহান আল্লাহর পরিচয়, অন্য সবার কাছে স্পষ্ট নয়। অন্যরা জ্ঞান আহরণের জন্য দুনিয়া চষে বেড়ায়। প্রকৃতিকে স্রষ্টা বানায়। প্রকৃতির স্রষ্টাকে, এখনও তারা তা খুঁজে পায় নি। সমুদ্রের অতলে ডুবুরি পাঠিয়ে এবং মহাশূন্যে মহাকাশস্টেশন-রকেট-সেটেলাইট পাঠিয়ে সৃষ্টির রহস্য বা রহস্যকারী স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ায় লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার খরচ করে। আর অন্যদিকে যারা স্রষ্টাকে বহুপূর্ব থেকে চিনে, যেসব রাষ্ট্র, প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানকে মূল জ্ঞান ধরে নিয়ে মানবজাতির কল্যাণে কাজ করে, তাদেরকে ব্যাক ডেটেট হিসেবে ধ্বংস করে। শুধুই ধ্বংস করে না, যেখানে রিভিল নলেজ, সেখানেই আণবিক-পারমাণবিক বোমা। কারণ স্রষ্টাকে চিনে ফেললে সভ্য-শালীন-শোভন ও সংস্কৃতিমান সৃষ্টি হয়। এতে ব্যবসা হয় না। বাণিজ্য হয় না। নারীকে পণ্য বানানো যায় না। কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই দুনিয়ার ভালো-মন্দ সকল প্রচেষ্টা-অন্যরা শুধুই প্রাণি, মানুষ বলে গণ্য নয়। যারা মুসলিম দেশগুলো যুগে-যুগে, কালে কালে ধ্বংস করে চলছে, তাদের একটাই অভিপ্রায় তারা বাধা-বন্ধনহীনভাবে জন্তু-জানোয়ারের মতো জীবন-যাপন করতে চায়। এ বিষয়ে বাধা একমাত্র মুসলিম জাহান। সুতরাং বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠতম মানবিক কাজ হলো মুসলিম দেশ ও মুসলিম জ্ঞানীদের, ধ্বংস করা।

সামান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ব্যবস্থার বিশ্লেষণ ছাড়াও আমরা এই আলোচনা থেকে কী পাচ্ছি? তা হলো প্রতিটি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা দুই/তিনটি বড়গুণ পুশ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। সেই গুণগুলোর মধ্যে কোনটা প্রধান, কোনটা দ্বিতীয় এবং কোনটা তৃতীয়Ñ সেই বিষয়টি কিশোরকালের শুরুতেই উদ্ভাসিত হয়। কে নরম-কে গরম, কে শান্ত- কে অশান্ত, কে প্রতিবাদী- কে অপ্রতিবাদী, কে কামপ্রবণ -কে কামহীন, কে ক্রোধি -কে ক্রোধহীন, কে লোভী-কে লোভহীন, কে মোহগ্রস্ত-কে মোহহীন, কে মাৎসর্যপন্থী -কে মাৎসর্যহীন, কে সুন্দর মনের মানুষ হবে- কে অসুন্দর মনের মানুষ, কে আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ হবে- কে ডাকাত দলের সর্দার হবে, কে প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা ও মমতার মানুষ হবে-কে নির্মম-নিষ্ঠুর পশুর চেয়ে অধম হবে, কে সৃষ্টিশীল হবে, সৃজনশীল হবে-কে কাটখোট্টা চিন্তাশীল ও গবেষক হবে, কে নেতা হবে- কে কর্মী হবে, কে অনুসারী হবে- কে অনুস্মরণকারী হবে, কে শিষ্য হবে-কে অনুস্মরণকারী বানাবে, কে কল্যাণকামী- কে অকল্যাণকামী সবই ১০/১২ বছর বয়সের মধ্যেই অনুধাবন করা যায়।

কার বিরুদ্ধে পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও মহল্লার লোকেরা অভিযোগ করে, কার বিরুদ্ধে অনুযোগ করে এবং কার বিরুদ্ধে প্রশংসা করে, সেটা কি বোঝা যায় না? আন্দাজ করা যায় না? উপলব্ধি করা যায় না? আবার কেউ কেউ সংস্কারপন্থী হয়। কেউ কেউ তওবাকারী হয়। কেউ কেউ ভালোর দিকে ফিরে আসতে চায়। কেউ কেউ মেয়েদের পেছনে ছোটে। কেউ কেউ ছোটে মেধাবীদের পেছনে, ভালদের পেছনে, প্রশংসা অর্জনকারীদের পেছনে। আবার একই সুন্দর পরিবারের কিশোর-কিশোরী, কিশোর-কিশোরী গ্যাংক খুঁজে বেড়ায়। কেউ ছোটে মসজিদ-মন্দির-চার্চ ও প্যাগোডার দিকে আবার তারই বন্ধু-বান্ধবরা ছোটে রেস্টুরেন্ট-পার্ক-নিভৃত স্থান-বার-নাইট ক্লাব ও হোটেলের দিকে।

আমাদের সময়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলেই প্রথম দিনের, প্রথম ক্লাসে, প্রথম শিক্ষক ক্লাসে এসে হাসি মুখে সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন-তুমি জীবনে কি হতে চাও। স্যার, প্রতি ছাত্রের নামের পাশে তার এম্বিশনটা লিখে রাখতেন। সে শিটটা স্যারদের কাছে থাকতো। সেটা শিক্ষক কমনরুমে সংরক্ষিত থাকতো। বলা হতো, ‘মর্নিং শোজ দা ডে’। বিশ্বব্যাপী এ প্রথা এখনও প্রচলিত আছে। আমাদের দেশে এর কতটা বাস্তবায়ন আছে জানি না।

লেখার শুরুতে ‘অরুন্ধতি রায়’-এর কয়েকটি উদ্ধৃতি প্রকাশ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, বেজ গিটারিস্ট... গিটারিস্ট হতে পারেন না। কথাটা যে কত সত্য তাকি আমরা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। প্রত্যেকের জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা আলাদা-আলাদা মিশন এবং ভিশন পুশ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। পরিবার, অভিভাবক, শিক্ষক এদের কাজ হলো কিশোর-কিশোরীরা কি হতে চেয়েছিলো এবং কিভাবে বেড়ে উঠছে তার পরিক্ষণ ও নির্ণয়ন করা। সেটা করতে পারলে বা করা গেলে গিটারিস্ট গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন না। গায়ক ড্রামার হতে চাইতো না। ড্রামার আবার গিটারিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতো না। এখন আমাদের দেশে কী দেখছি? দেখছি যে কিশোরটি স্কুল জীবনে চুরি-চামারী করে বেড়াতো, সে বড় জীবনে হয়ে গেছে ব্যাংকের মালিক। যে গান গেয়ে বেড়াতো, সে হয়ে গেছে মসজিদের ইমাম। যে ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে মারামারি কাতো, সে হয়ে যায় দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট। যে কবিতা লিখতো, সে হয়ে যায় বড় গবেষক। যে প্রচুর লেখাপড়া করতো, সে হয়ে যায় পুলিশ। যে কখনও ব্যবসার কথা ভাবেনি-চিন্তা করেনি, সে হয়ে যায় চোরাকারবারি। যে মাদরাসার শিক্ষক হতে চেয়েছিলো, সে হয়ে যায় ইনকাম টেক্সের অফিসার বা উকিল। যে সমুদ্রকে ভয় করতো সে হয়ে যায় সমুদ্র বন্দরের মাল খালাসকারী। যার যার কাজ এবং যে যা হতে চেয়েছিলাম সেটা আমরা কার্যকারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতে পারি নি। যে যেটা জানে বা যে যেটা প্রমোট করতে চায় সে সেটা পারেনি। এর জন্য দায়ী শুধু ব্যক্তি বিশেষ নয়। দায়ী তার পরিবার, বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ এবং সে সময়কার রাজনীতি। আজ সবাই টাকার পেছনে ছুটছে। নিজের পছন্দ-অপছন্দ এবং নিজের মিশন-ভিশনের দিকে তাকাচ্ছে না। শুধু তাকাচ্ছে কোন্ পেশা গ্রহণ করলে ন্যায়-অন্যায়ভাবে বহুটাকা অর্জন করা যায়। দেশ-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করা যায়। সন্তানদেরকে দেশ ছাড়ানো যায়। এই অবস্থার আশু পরিবর্তন না করতে পারলে দেশ অবশ্যই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক