সিপিডির সেমিনারে বিশিষ্টজনরা
স্টাফ রিপোর্টার
সিডিপির সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, দেশে জ্বালানি সংকট এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই বলে জানান তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সংস্থার সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির। তিনি সিপিডির পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকট কাটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির সুপারিশ তুলে ধরেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন । তিনি বলেছেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।
সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’
মন্ত্রী জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ, নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়।
এ ছাড়া বর্তমান ব্যবস্থাপনা কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, বিদেশি প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’
মন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে বলেও সতর্ক করেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বলে, যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে।
গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, শিল্পে গ্যাস–সংকট কমাতে বিকল্প নানা উপায় খোঁজা হচ্ছে। এর মধ্যে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস কারখানায় পৌঁছে দিতে একটি কোম্পানিকে ৩০টি ট্রাক চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা তৈরি করতে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছে সরকার।
মন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলোর বেশির ভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় (পিক আওয়ার) বদলে রাত ১২টায় গিয়ে ঠেকছে এবং মোট চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। তবে এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন।
তেল নিয়ে বিভিন্ন সময় গুজব ছড়ানোয় সংকট আরও বাড়ে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে একচেটিয়া তেলের ব্যবসা দেওয়া হচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে যাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তেল আমদানি করতে পারে, সে বিষয়ে একটি নতুন নীতি করা হচ্ছে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং এই খাতে পাঁচ বছরের ট্যাক্স হলিডে (করছাড়) সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
নিজেকে একজন উদ্যোক্তা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দেওয়া কতটা কঠিন, তা তিনি ভালোভাবে বোঝেন। তাই সংকট কাটানোর সব ধরনের চেষ্টা চলছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন বলেও জানান মন্ত্রী।
ফখরুদ্দিন আল কবির বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে একদিকে আমদানির ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রারও অপচয় হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের সুপারিশ করে সিপিডি। একই সঙ্গে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল রিজার্ভ বা জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এ ছাড়া আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্য ওঠানামা সামলাতে এবং নি¤œ আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে সুনির্দিষ্ট নীতির আহ্বান জানানো হয়।
দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন উল্লেখ করে বিসিআই সভাপতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ডেভিড হাসনাত আরও বলেন, দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করতে পোর্টের খালাসপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেওয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সোলারে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব।
দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের জন্য সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লসকে দায়ী করেছেন জ্বালানি–বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
তিনি বলেন, সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে।
ইজাজ হোসেন আরও উল্লেখ করেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। তাই বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্প খাতকেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর শিল্পে জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের স্পষ্ট অগ্রাধিকারের দাবি জানান।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘’জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি।’ তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এ ছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন।
আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।