দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত ও রাজনীতিতে শুদ্ধাচারের অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতায় জুলাই বিপ্লব প্রাসঙ্গিক ছিলো। সে ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী রেজিমের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে। এ সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে জনমতও। কারণ, পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিলো। ধ্বংস করা হয়েছে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। দলীয়করণ করা হয়েছিলো জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রশাসন, বিচারবিভাগসহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে পরিণত করা হয়েছিলো দলদাস কমিশনে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে পরিণত করা হয়েছিলো বিরোধী দল নিগ্রহ ও সরকারি দলের নেতাদের দায়মুক্তির জন্য ‘দায়মুক্তি কমিশন’ হিসাবে। তাই ফ্যাসিবাদের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠেছে। সে দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রাষ্ট্র সংস্কারের নানাবিধ পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু আমরা একথা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি যে, শুধু রাষ্ট্র সংস্কার হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সকল সমস্যার সমাধান হবে না এবং এ জন্য চাই প্রচলিত রাজনীতির সংস্কার। একই সাথে রাজনীতিকদের আত্মসংস্কারও। কারণ, নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত থাকলেও ক্ষমতার উষ্ণ পরশে গণেশ একেবারে উল্টে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। যা আমাদের প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতির বাস্তবচিত্র।

মূলত, গণমানুষের কল্যাণের ধারণা থেকেই রাজনীতির বুৎপত্তি ঘটেছে। রাজনীতির উদ্ভব হয়েছে মানবসভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে রাজার রাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে। মেকিয়াভেলী রচিত ‘The Prince’ গ্রন্থটি রাজতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়িত্ব নিয়ে বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত বিশ্লেষণ করেছে। বস্তুত, রাজনীতি হলো এমন এক বিশেষ চেতনা বা আদর্শ; যার উদ্দেশ্য শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা সর্বোপরি মানবকল্যাণ। কিন্তু আমাদের দেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তা যে ছন্দ ও স্বরূপ উভয়ই হারিয়েছে বেশ আগেই। তাই রাজনীতি থেকে আমরা কাক্সিক্ষত কল্যাণ পাচ্ছি না।

রাজনীতি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছুসংখ্যক বা বহুসংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার নিমিত্তে ঐক্য স্থাপন করে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে রাজনীতিতে স্বার্থবাদিতা, উচ্চাভিলাষ ও আত্মপূজার অনুষঙ্গ যুক্ত হওয়ায় তা স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র হারিয়েছে। রূপ, রস, গন্ধ ও আবেদনও হারিয়ে ফেলেছে চলমান রাজনীতি। পাত্র-মিত্রদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অদৃশ্য ও অশুভ শক্তির হাতেই চলে গেছে। যা আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তিমূলকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।

ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা এবং স্বার্থান্ধতা আমাদের রাজনীতির জীবনীশক্তিকে চলৎশক্তিহীন করে ফেলেছে। সঙ্গত কারণেই রাজনীতি হারিয়েছে গণমুখী চরিত্র। স্থান করে নিয়েছে আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, শ্রেণিস্বার্থ, সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থসহ শ্রেণি বিশেষের উচ্চাভিলাষ। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হতে শুরু করেছেন। মূলত, রাজনীতি এখন শ্রেণিবিশেষের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ ও আত্মপূজার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হলেও পশ্চাদপদ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে তা পণ্ড হয়ে যেতে বসেছে।

আমাদের জাতীয় রাজনীতির এ বিচ্যুতি ক্ষমতাবানদের কাছে কখনোই গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে রাজনৈতিক শক্তিগুলো এক্ষেত্রে খুবই উদাসীন। কিন্তু ঠিকই গুরুত্ব পেয়েছে ক্ষমতাহীন ও সাধারণ মানুষের কাছে। আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি নানাবিধ জটিলতায় ঘুরপাক খেয়েছে। তাই রাজনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নীতির রাজাকে ধারণ ও চর্চা করাই হচ্ছে রাজনীতি। এজন্য রাজনীতিকে আরও পরিশীলিত, পরিমার্জিত এবং সৃজনশীল করা দরকার। রাজনীতি যদি সৃজনশীল না হয় তাহলে আমাদের ভবিষ্যত ভালো হওয়ার অবকাশ থাকবে না। রাজার নীতিকে রাজনীতি বলা থেকে দূরে সরে এসে শ্রেষ্ঠ নীতি, নৈতিকতা, সততা ও মূল্যবোধকে ধারণ করতে রাজনীতি অর্থবহ ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে। যখন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও ভালো মানুষের কদর কমে যায় তখন সমাজ ব্যবস্থা ও সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সমন্বিত চিন্তা ধারণ, লালন, চর্চা এবং বিশ্বাস।

মূলত, আমাদের দেশের রাজনীতি এখন একশ্রেণির সুবিধাবাদী মানুষের নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের বৃত্তেই বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই আমাদেরকে এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। যারা রাজনীতি করতে চান, তাদের শুধু ক্ষমতাকেই রাজনীতি মনে না করার তাগিদ এসেছে বিবেকবান ও আত্মসচেতন মানুষের পক্ষ থেকে। জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে ন্যায়, সততা ও আদর্শের রাজনীতিকে ধারণ করাও এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দেখা দিয়েছে।

ভিন্নমত রাজনীতির একটি অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। এতে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। যার মধ্যে আছে কারও নিজস্ব রাজনৈতিক অভিমত মানুষের মাঝে প্রচার করা, অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় ও আইন প্রণয়ন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ প্রায়ই নিজস্ব মতবাদ তুলে ধরতে রাজনৈতিক দল গঠন করে। দলের সভ্যগণ প্রায়শই বিভিন্ন বিষয়ে সহাবস্থানের ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করে। এক্ষেত্রে নির্বাচন হল সাধারণত বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য আর্ত-মানবতার কল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থ। তাই রাজনীতি কখনো কারো উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার অনুসঙ্গ হতে পারে না। কিন্তু নিকট অতীতে আমাদের দেশে রাজনীতিতে এমন অশুভ চর্চা হয়েছে। এখন এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার একটি ভালো সুযোগ সৃষ্টি তা আমরা কতখানি কাজে লাগাতে পারছি, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো এমন কাঠামো যা কোন সমাজের মধ্যকার গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পদ্ধতিসমূহকে সংজ্ঞায়িত করে। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিবৃত্ত খুঁজে পাওয়া যায় অতিপ্রাচীন যুগে; যেখানে প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের রাজনীতি, চাণক্যর অর্থশাস্ত্র ও চাণক্য নীতি এবং কনফুসিয়াসের লেখার ন্যায় দিগন্ত উন্মোচনকারী কাজগুলোর মধ্যে। মূলত, রাজনীতি সাধারণ অর্থে নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকান্ডকে বোঝানো হয়। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। উইলিয়াম কেরি তার বাংলা অভিধানে রাজনীতি শব্দের অর্থ করেছেন রাজন্য (the king) + নীতি (justice), অর্থাৎ রাজার ন্যায়বিচার। বার্নার্ড ক্রিক দাবি করেন যে, ‘রাজনীতি হল নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের অসামঞ্জস্য মিটিয়ে ফেলা, বৈচিত্র্যময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে’। আড্রিয়ান লেফ্টউইচের মতে, ‘রাজনীতি সমাজ ও সমাজসমূহের মধ্যে সমবায়, মতবিনিময় ও দ্বন্দ্বের সকল কাজের জন্ম দেয়। যার দ্বারা মানুষ তাদের জৈবিক ও সামাজিক জীবনের উৎপাদন ও প্রজননের নিমিত্তে মানবীয়, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার, উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে’। এক কথায় রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে গণমানুষের কল্যাণে যা কিছু প্রয়োজন তার সকল কিছুই নিশ্চিত করা।

রাজনীতি ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার অনুশীলন হিসাবে দেখা হয়। আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে আদর্শিক ভিত্তিতে সামাজিক ক্রিয়া হিসাবে দেখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এ পার্থক্যকে বলা হয় রাজনৈতিক নৈতিকতাবাদ এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদের মধ্যে পার্থক্য। নৈতিকতাবাদীদের বিবেচনায় রাজনীতি হল নীতিশাস্ত্রের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত বিষয় এবং অতি আদর্শ চিন্তার ক্ষেত্রে এর অবস্থান সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এক্ষেত্রে এরিস্টটলের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, রাজনৈতিক হওয়ার অর্থ হল সবকিছুই কথা ও যুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়। সবকিছুই হতে হবে সুশৃঙ্খলভাবে। সেখানে বার্নার্ড ক্রিকের বক্তব্য হচ্ছে, রাজনীতি হল উন্মুক্ত সমাজ পরিচালনার পন্থা। রাজনীতি হলো রাজনীতি আর অন্য প্রকারের নীতিনিয়মগুলো হলো অন্যকিছু।

আন্তঃসরকারি সংস্থা এবং বহুরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধতার মাধ্যমে বিশ শতকে রাজনৈতিক বিশ্বায়নের সূচনা হয়েছিল। লিগ অব নেশনস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটি জাতিসংঘ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আঞ্চলিক সংহতকরণের উদ্দেশ্যে তৈরি হয় আফ্রিকান ইউনিয়ন, আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মারকোসু। আন্তর্জাতিক স্তরের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

মূলত, জাতীয় রাজনীতি নাগরিকদের কল্যাণের নিয়মনীতিতে পরিচালিত না হলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনোই সার্থক ও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে সুশাসন হচ্ছে অন্যতম অনুসঙ্গ। বস্তুত নিয়মকানুন, আইন, বিচারসহ রাষ্ট্রাচারের সকল অনুষঙ্গের স্বাভাবিকতায় ব্যত্যয় না ঘটিয়ে জনগণ, প্রশাসন, রাজনৈতিক শক্তিগুলো তথা রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সবকিছুইকেই আধুনিকতা ও সাংবিধানিক মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে সুশাসন। কোন সমাজরাষ্ট্রে যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় তখন সেখানে আধুনিকতার মানদণ্ডে রাষ্ট্র উন্নীত হতে পেরেছে বলে মনে করা হয়। আর এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন হয় ইতিবাচক ও গণমুখী রাজনীতি। যেখানে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের বিপরীতে জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায়। ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিক জীবন সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়ে ওঠে; রাষ্ট্র পরিণত হয় কল্যাণরাষ্ট্রে।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাসহ উন্নত জীবনব্যবস্থার নিশ্চয়তা প্রদান। এ ক্ষেত্রে নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করতে হলেও আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আজও অধরাই রয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের চলমান স্বার্থবাদী নেতিবাচক রাজনীতি এবং একশ্রেণির রাজনীতিকের আদর্শিক দেউলিয়াত্ব। মূলত আধুনিক রাষ্ট্র বলতে শুধু অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদতা দূরীভূত করার মাধ্যমে সমৃদ্ধির দিকে ধাবিত হওয়াই নয়, একই সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে গড়ে তোলাকেও অধিকতর গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

অবশ্য ক্ষমতাসীনরা সব সময় বলে থাকে যে, তারা গণমানুষের কল্যাণেই সব সময় রাজনীতি করে থাকেন। তাদের রাজনীতির সকল কিছুই মানবকল্যাণে নিবেদিত। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সব সময় আমাদেরকে এমন আপ্তবাক্যই শুনিয়ে এসেছে সব সময়। কিন্তু তাদের এমন দাবি কখনোই বাস্তবসম্মত ছিলো না বরং ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ বলেই গণ্য করা হচ্ছে। বস্তুত, তারা যেসব অর্জনের বিষয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়েছেন তা ইতিবাচক ও গতিশীল রাজনীতি ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। আর আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি এখনও সে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। রাজনীতি আটকে পড়েছে একটা সংকীর্ণ বৃত্তে। ফলে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রেই আজও অপূর্ণই রয়ে গেছে।

মূলত, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা এসব ক্ষেত্রে সম্মিলিত অগ্রগতি ছাড়া কোন জাতিই আত্মনির্ভরশীল হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আংশিকভাবে চললেও পরিপূর্ণ আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় আমাদের উত্তরণ প্রশ্নসাপেক্ষই রয়ে গেছে। সঙ্গত কারণেই এখন আমাদের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক বিপ্লবের চাকা সচল রাখার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আধুনিক মতাদর্শের চর্চা সুসংহত করা। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্বপ্রথম যে কাজটি অত্যাবশ্যকীয় তা হলো দেশের চলমান রাজনীতিকে নেতিবাচক বৃত্ত থেকে বের করে এনে একটি গণমুখী রাজনীতির সূচনা করা। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোন অর্জন নেই বললেই চলে।

আমাদের দেশের রাজনীতি যে নেতিবাচক বৃত্তে আটকা পড়েছে তা নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই চলমান রাজনীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। একই সাথে রাজনীতিকে আরও ক্রিয়াশীল পরিশীলিত, পরিমার্জিত ও সৃজনশীল করার তাগিদও এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সমাজের ভালো মানুষের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এ মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করা কোন একক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে সম্ভব নয় বরং জাতীয় ঐক্যমতই পারে আমাদেরকে এ অচলাবস্থা থেকে মুক্তি দিতে। কিন্তু এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের দায়িত্বটাই সবচেয়ে বেশি। শুধু অমৃতবচন বা কথামালার ফুলঝুড়ির মাধ্যমে কোন সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনীতিকদের হতে হবে আদর্শবাদী ও বাস্তবমুখী।

এমন এক বাস্তবতায়ই দেশে জুলাই বিপ্লব হয়েছে। পতন হয়েছে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর। কক্ষচ্যুত দেশ ও জাতিকে কক্ষপথে ফেরানোর জন্য প্রণীত হয়েছে জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ। এ সনদকে আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার জন্যই গণভোট অধ্যাদেশ ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে গণম্যান্ডেট প্রদান করেছে। কিন্তু নেতিবাচক রাজনীতি আমাদের পিছু ছাড়েনি। ক্ষমতাসীনরা জুলাই বিপ্লবের সুবিধাভোগী হলেও দেশ ও জাতিকে সে সুবিধার ভাগীদার করতে চায় না বরং জুলাই সনদ প্রত্যাখান করে নিজেরাই নতুন আঙ্গিকে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠার দিবাস্বপ্নে বিভোর। যা দেশ ও জাতির সাথে প্রতারণা বৈ কিছু নয়।

মূলত জুলাই আমাদের জাতীয় জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। তাই দেশে সুশাসন এবং দেশকে আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য জুলাই সনদ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই। কারণ, জুলাই-ই আমাদেরকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। এমতাবস্থায় জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি রাজনীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। রাজনীতিকরা যদি তাদের নেতিবাচক বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারেন, তাহলে শুধুই রাষ্ট্র সংস্কার কোন কাজে আসবে না বরং নিষ্ফলা হয়ে যাবে আমাদের সকল অর্জন। তাই রাজনীতিকদের আত্মসংস্কার ও আত্মসমালোচনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় কোন কিছুই আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে না; অতীত বৃত্ত ভাঙা যাবে না কোনভাবেই।

www.syedmasud.com