পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জেনারেল ইকোনমিক ডিপার্টমেন্ট (জিইডি) ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এ পরিকল্পনার অধীনে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে উত্তরণের দিকে ধাবিত হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগকে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে সম্প্রসারিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের অনুবর্তী বলা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার জন্য বর্তমান সরকার রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের জিডিপি’র বর্তমান আকারকে দ্বিগুণ করতে হবে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশের জিডিপির আকার হচ্ছে ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কিছু বেশি। দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান বাস্তবতায় এ লক্ষ্যার্জন বেশ কঠিন হবে বলেই মনে হচ্ছে। সরকার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি শীর্ষক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

এ কার্যক্রমের আওতায় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও গতিময় করা হবে। ব্যাংকিং সেক্টরকে সমস্যামুক্ত এবং শেয়ার বাজারকে গতিশীল করা হবে। উদ্যোক্তাগণ যাতে অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে শেয়ারবাজারমুখী হতে উৎসাহী হয় সে লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আগামী ৫ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩০-২০৩১ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় ৪ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে দেশের মানুষের গড় জাতীয় আয় ২ হাজার ৯৫৮ মার্কিন ডলার। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তার অর্থ হচ্ছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জাতীয় আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ শতাংশ।

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা এবং গতিময়তা আনতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে, দেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আমাদের মধ্যে উন্নয়ন বলতে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। বিগত সরকার আমলে উন্নয়ন বলতে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বুঝানো হতো। জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারী সরকারের একটি প্রবণতা হচ্ছে, তারা উন্নয়নের নামে অবকাঠামোগত খাতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে। পাকিস্তান আমলে আমরা আইয়ুব খানের সময় দেখেছি কিভাবে দেশের অবকাঠামোগত খাতে উন্নয়ন করা হয়। সামরিক শাসক এরশাদের সময় রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানো হয়। আর আওয়ামী লীগ আমলে রাস্তা-ঘাট এবং মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে এগুলো দৃশ্যমান এবং জনতুষ্টির কারণ হতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলের উন্নয়ন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল অতি উন্নয়নের নামে অতি দুর্নীতি। তারা উন্নয়নের নামে বিদেশি থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ এনে তা লুটপাট করেছে। তারা অবকাঠামোগত উন্নয়নে এতটাই মত্ত হয়েছিল যে, এক সময় বলা শুরু করেছিল ‘উন্নয়ন আগে, নাকি গণতন্ত্র।’ তারা কার্যত এটাই বলতে চেয়েছিল যে, উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেয়া যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের সেই উন্নয়ন দর্শনের নামে গণতন্ত্র হত্যাকে কোনভাবেই সমর্থন করে নি।

উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বুঝায় না। উন্নয়ন একটি সামগ্রিক ধারণা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আবাসন, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণ ইত্যাদি সব খাতেই যৌক্তিক উন্নয়ন ঘটতে হবে। এর কোনটি বাদ দিয়ে অন্যগুলোর উন্নয়ন সাধিত হলে তাকে কখনোই সার্বিক উন্নয়ন বলা যাবে না। সে উন্নয়ন কখনোই টেকসই এবং স্থিতিশীল হবে না।

বাংলাদেশ উন্নয়নের মূল ধারণা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড যুগে প্রবেশ করে এবং ২০০৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণমাত্রায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সূচনা হয়। কারণ সে সময় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করলেও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোন সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম গতানুগতিক ধারাতেই চলছে। ফলে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারছি না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অভিজ্ঞজনদের মতে, বাংলাদেশ ২০৪০ সাল পর্যন্ত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এটি অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার হচ্ছে ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে হিসেবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হলে প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। প্রতিবছর স্থানীয় এবং বিদেশি মিলিয়ে অন্তত ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য বিনিয়োগ আহরণ করতে হবে। যে কোন অর্জনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী বা দক্ষ জনশক্তি। কিন্তু জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে সীমাহীন ব্যর্থতা। বাংলাদেশের জনশক্তির বেশিরভাগই অদক্ষ এবং প্রশিক্ষণবিহীন বলে তাদের উৎপাদনশীলতা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। যেমন উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সামগ্রি রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম অবস্থান করছে তৃতীয় স্থানে। কিন্তু ভিয়েতনাম যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশটি যে কোন সময় বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসবে। ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি। একজন ভিয়েতনামী শ্রমিক প্রতি বছর জিডিপিতে ৪ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন করে। আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিক প্রতি বছর জিডিপিতে ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন করে থাকে। অর্থাৎ ভিয়েতনামী শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ভিয়েতনামী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশি হবার মূল কারণ। ভিয়েতনামী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এবং পুষ্টি মান বেশি হওয়ার কারণে তারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে শারীরিকভাবে বেশি সক্ষম এবং কাজে অধিক মনোযোগী হয়ে থাকে।

জনশক্তিকে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা সীমাহীন। আশির দশকে অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দেশের ‘এক নাম্বার জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এটা ছিল চরম ভুল। কারণ জনসংখ্যা তা পরিকল্পিতই হোক আর অপরিকল্পিতই হোক কখনো এক নাম্বার জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। কারণ জনসংখ্যা এমন এক উপকরণ যা ছাড়া কোন উৎপাদন কার্য সম্পাদিত হতে পারে না। জনসংখ্যা যদি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ হয় তাহলে তা যে কোন জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। আর জনসংখ্যা যদি অপ্রশিক্ষিত, অদক্ষ এবং পরনির্ভর হয় তাহলে তা জাতির জন্য সবচেয়ে ‘বড় দায়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জনসংখ্যাকে উন্নততর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তার দায়ভার শুধু রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। কোনভাবে এ দায়িত্ব জনগণের ওপর চাপানো যাবে না।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি দেশ কিভাবে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে তার জ¦লন্ত উদাহরণ হচ্ছে চীন। দৈশটি এক সময় তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ একটি উন্নয়নশীল দেশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিস্ময়ের সৃষ্টি করে চলেছে। চীনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার শুরু হয় ১৯৭৯ সালে এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে। ২০১৪ সাল থেকে চীনে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার বাড়তে থাকে। চীন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পরিকল্পিত এবং সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। যার ফল তারা হাতে হাতে পেয়েছে। কয়েক বছর আগে চীন জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তিশালি রাষ্ট্রের অবস্থানে উঠে এসেছে। চীন ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব অর্থনীতিতে জাপানকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সে সময় চীনের জিডিপির আকার ছিল ৫ দশমিক ৮৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর জাপানের জিডিপির আকার ছিল ৫ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপান ১৯৬৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মোট ৪২ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে অবস্থান করছিল। চীন ২০৩৫ থেকে ২০৩৭ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। অবশ্য কোন কোন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, চীনের কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার কমতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় দেশটি যদি শ্রম শক্তির উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে না পারে তাহলে হয়তো কোনদিনই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না। বর্তমানে চীনের জিডিপির পরিমাণ ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির আকার ৩২ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

শুধু উন্নয়ন উন্নয়ন করলেই চলবে না। উন্নয়নের সুযোগগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন আমাদের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্রেজাইলিটি টু প্রসপারিটি’ কার্যক্রমের আওতায় ২০৩০-২০৩১ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণ করা হবে। কিন্তু মাতাপিছু গড় জাতীয় আয় এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে কখনোই একটি দেশের সত্যিকার উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে এক বছরে যে আয় হয় সেটাই জিডিপি। আর জিডিপির সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স এবং বিদেশে ব্যবসায়রত বাংলাদেশিদের প্রেরিত লভ্যাংশ যোগ করলে যে অর্থ পাওয়া যায় সেটাই মোট জাতীয় আয়। জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয় গণনার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তার মধ্যেই গলদ রয়েছে। গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় দ্বারা কখনোই একটি দেশের মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ণয় করা যায় না। এতে দরিদ্র এবং বিত্তবান উভয় শ্রেণির মানুষের প্রতি অবিচার করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের গড় জাতীয় আয় যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কিন্তু তারপর কি বলা যাবে মানুষ ভালো আছে? বিত্তবান-বিত্তহীনের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিনই বাড়ছে।

এ মুহূর্তে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বৃদ্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানো। কিন্তু সাধারণ নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে না। যেকোন মূল্যেই হোক উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক লেখক।