আয়েশা সিদ্দিকা
নারীর অধিকার ও মর্যাদা সাম্প্রতিক বিশ্বে বহুল আলোজিত ও চর্চিত বিষয়। বিষয়টি নিয়ে নানা মত ও নানা পথ রয়েছে। একশ্রেণির মানুষের কাছে যা অধিকার; অপর শ্রেণির মানুষের বিবেচনায় তা অনাধিকার। কেউ কেউ আবার নারীকে পুরুষের সমান্তরলীকরণকেই নারীর প্রকৃত অধিকার বা মর্যাদা মনে করেন। কিন্তু নারী ও পুরুষের মধ্যে যে সৃষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে তা তারা কোন ভাবেই বিবেচনায় আনেন না। সর্বোপরি একথাও তারা ভুলে বসেন যে, পুরুষ ও নারী আলাদা বা স্বতন্ত্র স্বত্তা। তাই উভয়কে কোন ভাবেই সমান্তরাল করা সম্ভব নয় বরং স্ব স্ব অবস্থানে থেকেই তারা ন্যায্য অধিকার পাওয়ার হক্বদার।
ইসলাম নারীকে যথাযথ মর্যাদা দেয়নি বা ঠকিয়েছে তা শ্রেণি বিশেষের কাছে খুবই মুখোরোচক আলোচনা। অথচ ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। পবিত্র কালামে হাকিম ও সুন্নাহর আলোকে নারীদের শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির মালিকানা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিয়ের ক্ষেত্রে সম্মতির অধিকার এবং স্বামীর সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে নারীদের সম্পদের মালিক হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। পিতা, স্বামী বা অন্যান্য আত্মীয়ের সম্পত্তিতে নারীরা নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারী হন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিংবা নিজে উপার্জন করা সম্পদে ওই নারীর একক মালিকানা থাকে। একজন নারী তার জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মতামত প্রদানের অধিকারী।
ইসলামে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া বিয়ের সময় কনের পক্ষ থেকে দেনমোহর গ্রহণ করা স্ত্রীর আইনগত অধিকার। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর ওপর ফরজ বা অত্যাবশ্যকীয়। দ্বীনি ও পার্থিব শিক্ষা গ্রহণে নারীদের কোনো বিধিনিষেধ নেই। মা হিসেবে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে। কন্যাশিশু বা বোনের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব পালনকে বড় পূণ্য বা মহতি কাজ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নারীদের ইসলামের আওতায় থেকে এবং বৈধ উপায়ে উপার্জন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ইসলামে নারীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ পুরুষ (পিতা, স্বামী বা ভাই)-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। একজন নারী কোনো উপার্জনের অধিকারী হলে সে অর্থ নিজ ইচ্ছামতো খরচ করতে পারেন, পরিবারের পেছনে তা খরচ করা তার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যা নারী সমাজের জন্য বিশেষ মর্যাদার অন্তর্ভূক্ত।
বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে আসছে দীর্ঘ পরিসরে। বিভিন্ন সভাও দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিও পালিত হয় অধিকার আদায়ে। অজ্ঞতাবশত কেউ কেউ নারীর অধিকার হরণে ইসলামকে দায়ী করে থাকেন। অথচ পবিত্র কুরআনে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অধিকার নিশ্চিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় পুরুষকেই নির্দেশনা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসলামের আবির্ভাবের আগে নারীর মর্যাদা বা অধিকার বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, নবিকূল শিরোমণি হজরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)-এর আবির্ভাবে নারীরা তাদের যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ‘নিসা’ অর্থাৎ ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ‘নিসা’ তথা ‘মহিলা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র বৃহৎ সূরাও রয়েছে। এ ছাড়া কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। দিয়েছে নারীর জান-মালের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান।
আর নারীর অধিকারের কথা উল্লেখপূর্বক আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন : ‘নারীদের (পুরুষদের উপর) তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে যেমনি রয়েছে নারীদের উপর পুরুষদের’। (সুরা আল বাকারা, আয়াত-২২৮) এ আয়াতে যেমনি সুস্পষ্টভাবে নারীদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে এভাবে নারীর অধিকারের কথা বলা হয়নি। ইসলাম নারীকে দিয়েছে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান। নারীদের প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে মহানবী (সা) বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতেন। তিনিই (সা.) পৃথিবীতে সর্বপ্রথম নারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হাদিসে রাসূল (সা.)-এ উল্লেখ রয়েছে, হজরত হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া (রা.) তার পিতা মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হে আল্লাহর রাসুল! স্বামীর ওপর স্ত্রীর কী কী অধিকার রয়েছে? রাসূল (সা.) প্রত্যুত্তরে বললেন, তার অধিকার হলো যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যে মানের কাপড় পরবে, তাকেও সে মানের কাপড় পরাবে। তার মুখে আঘাত করবে না। অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করবে না’ (আবু দাউদ)। এ হলো ইসলাম ও রাসুল করিম (সা.)-এর আদর্শ। বর্তমানে আমরা মুসলমান এবং শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হওয়ার দাবি করছি ঠিকই, তবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এবং শ্রেষ্ঠ নবীর আদর্শ আমাদের মাঝে দেখা যায় না।
ইসলাম ও বিশ্বনবী (সা.) বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করেছেন। মানব মন ও মানব সমাজে নারী প্রগতির গোড়াপত্তন করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। ইসলামে নারীর স্বাধীন মত প্রকাশের মৌলিক বাক-স্বাধীনতা আছে। নর-নারী উভয়ে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে স্বীকৃত এবং কর্মফল অনুযায়ী জান্নাত লাভের সম অধিকার প্রাপ্য। যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করছেন, ‘তিনি তোমাদের একই সত্তা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবনসঙ্গিণীকে একই উপাদান হতে সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আন নিসা, আয়াত- ১)।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মোমেন অবস্থায় সৎকর্ম করবে সে পুরুষ হোক বা নারী সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (সুরা মোমেন, আয়াত : ৪০)। ইসলামের কষ্টিপাথরে নারী পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে শুধু পুরুষের সম-অধিকার নয় বরং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষ থেকে নারীকে অধিক মর্যাদা দিয়েছে।
মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত ঘোষণা করে ইসলাম নারী জাতিকে সর্বোত্তম মর্যাদায় ভূষিত করেছে। যে মর্যাদা পুরুষকে দেয়া হয় নি। ইসলামে একজন নারী একজন পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ও মর্যাদার অধিকারী। পারিবারিক জীবনে সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের প্রাধান্য থাকলেও সার্বিক মূল্যায়নে ইসলাম নারী জাতিকে পুরুষের অধিক মান-মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, যা অন্য কোন ধর্ম বা জাতিতে করেনি।
সভ্যতা বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান ইসলাম কখনো খাটো করে দেখেনি। বরং উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে নারীকে সাহস জুগিয়েছে। নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত নয়। এমনকি মুসলিম অধ্যুষিত সমাজ ও রাষ্ট্রে পর্যন্ত নারীদের অধিকার আরও বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে। মূলত ইসলামী সভ্যতার পতনের কারণেই আজ নারী অধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের অজ্ঞতাবশত কথিত নারী অধিকারের নামে নারী-পুরুষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন; বানানো হয়েছে একে অপরের প্রতিপক্ষ। অথচ নারী-পুরুষের প্রীতির সম্পর্ক ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় সৃষ্টি ও সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। আর ইসলাম নারীকে দিয়েছে সুউচ্চ মর্যাদার আসন ও যথাযথ সম্মান। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীদের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষা দিতে সকলকে ইসলামী অনুশাসনের দিকেই ফেরৎ আসতে হবে। অন্যকোন তন্ত্র, মন্ত্র বা পন্থায় নারীর অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।