বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় জাতীয় নির্বাচন যতটা গুরুত্ব পায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ততটা পায় না। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোথায় নিহিত, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সংসদ নয়, বরং স্থানীয় সরকারই রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি। কারণ একজন নাগরিক রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন তাঁর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়ক, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন, স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি, নাগরিক সেবা কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলা, রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এখানেই।
এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এরই মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধি দ্রুত চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন শুরু হবে। ইতোমধ্যে খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করে মতামত আহ্বান করা হয়েছে, সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের কাজ চলছে এবং তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, তফসিল দেয়া হবে আগস্টে এবং আসন্ন অক্টোবরেই প্রথম দফার নির্বাচন। অবশ্য সরকারের কিছু মন্ত্রীর পক্ষ থেকে আগামী বছরের শুরুতেও নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচনের যে কাঠামোগুলোতে দীর্ঘদিন যাবৎ কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, সেগুলোতেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইতিবাচক সংবাদ। কারণ দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নির্বাচন হয়নি। হাজার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি দীর্ঘমেয়াদে কাম্য হতে পারে না। ফলে নির্বাচন হওয়া জরুরি। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। নির্বাচন আয়োজন কি যথেষ্ট? নাকি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে নির্বাচন কতটা অবাধ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এ প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে গত প্রায় দেড় দশকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভোটকেন্দ্র দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপর চাপ, প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ, সহিংসতা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় সংকট তখনই সৃষ্টি হয়, যখন মানুষ ভোটের ফলাফল নিয়ে নয়, ভোট দেওয়ার পরিণাম নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। ভোটার যদি বিশ্বাস করেন, তাঁর ভোট ফল নির্ধারণ করবে না, তাহলে ভোটাধিকার ধীরে ধীরে একটি সাংবিধানিক অধিকার থেকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর হতে পারে না। এ কারণেই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে একটি সাধারণ নির্বাচন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নির্বাচন কমিশনের যেমন পরীক্ষা, তেমনি সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর, প্রশাসনের এবং নাগরিক সমাজেরও পরীক্ষা। এই নির্বাচন প্রমাণ করবে, বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি নতুন নির্বাচনী সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে, নাকি পুরোনো বিতর্কের বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে।
বাংলাদেশের সংবিধান স্থানীয় সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় জনগণ তাদের নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে উন্নয়ন ও সেবাব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় সরকার সে প্রত্যাশিত স্বাধীনতা খুব কমই পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক নির্ভরতা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহির চেয়ে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচনও ধীরে ধীরে স্থানীয় ইস্যুর পরিবর্তে জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের দায়িত্ব সবার আগে নির্বাচন কমিশনের।
সংবিধান কমিশনকে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা কেবল আইনের বইয়ে লেখা থাকলে তার কোনো মূল্য নেই; সেটি কার্যকর হতে হয় বাস্তব সিদ্ধান্তে। নির্বাচন কমিশনকে এমন একটি বার্তা দিতে হবে যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী, বিরোধী দলের প্রার্থী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী, সবার ক্ষেত্রেই একই আইন প্রযোজ্য হবে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অনেক সময় হাজারো বক্তৃতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; একটি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশনের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা আড়াল করা হবে। বিশ্বের কোনো গণতন্ত্রেই নির্বাচন কমিশন একা অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করে না। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া একটি নির্বাচন কখনোই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই বিরোধী দলে থাকাকালে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সমান নির্বাচনী সুযোগের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর একই দলগুলোর বিরুদ্ধেই কমবেশি রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ চক্র থেকে বাংলাদেশ এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ততটা ঘটেনি। এ কারণেই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু একটি সরকারের নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরীক্ষা। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার কেবল বক্তৃতায় নয়, প্রশাসনিক আচরণেও প্রতিফলিত হতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাপকভাবে স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে। যদি এ প্রশাসকরাই আবার সংশ্লিষ্ট কাঠামোতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হন, তাহলে নির্বাচনে তারা বাড়তি সুবিধা পাবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশাসনের ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে স্পর্শকাতর। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তাদের প্রত্যেকের আচরণ নির্বাচনের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নিরপেক্ষতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন সরকারি কর্মকর্তার আনুগত্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়; সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি। এ নীতিই একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাতে পারে, কিন্তু প্রশাসনের পেশাদারিত্ব বদলানো উচিত নয়। যে রাষ্ট্রে প্রশাসন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেই রাষ্ট্রেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়।
পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশন আইন প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে না। সেটি তৈরি করতে হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। বাংলাদেশে নির্বাচনকে প্রায়ই “জয় অথবা পরাজয়ের” চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে দেখা হয়। ফলে অনেক সময় নির্বাচনকে জনগণের রায় গ্রহণের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ মানসিকতা যতদিন পরিবর্তন না হবে, ততদিন নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা, অবিশ্বাস এবং সংঘাত পুরোপুরি দূর হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। একজন চেয়ারম্যান, মেয়র বা কাউন্সিলরের মূল্যায়ন হওয়ার কথা তাঁর সততা, দক্ষতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে। কিন্তু যদি দলীয় পরিচয়ই একমাত্র নির্ধারক হয়ে ওঠে, তাহলে স্থানীয় সরকার ধীরে ধীরে জনগণের প্রতিষ্ঠান না হয়ে রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত কার্যালয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি কোনো একটি দলের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের পরিসর হিসেবে দেখার অভিযোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেনি। অথচ স্থানীয় সরকারের মূল দর্শনই হলো জনগণের অংশগ্রহণ, স্থানীয় উদ্যোগ এবং বিকেন্দ্রীভূত শাসন। তাই স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে নেওয়া সম্ভব না হলেও অন্তত দলীয় আধিপত্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।
অতএব, অক্টোবরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কোনোভাবেই একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আসন্ন নির্বাচনের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করবে না; বরং আগামী দিনের জাতীয় রাজনৈতিক পরিবেশকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। বিশ্বের কোনো গণতন্ত্রই একদিনে শক্তিশালী হয়নি। শক্তিশালী হয়েছে নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং প্রশাসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
এমন বাস্তবতায় গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র নয়; আবার রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষও নয়। তার প্রধান দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা। নির্বাচনী অনিয়ম, আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা প্রশাসনিক পক্ষপাত যেমন নির্ভীকভাবে প্রকাশ করতে হবে, তেমনি ভিত্তিহীন অভিযোগ, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকেও বিরত থাকতে হবে। নির্বাচনকালে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিলাসিতা নয়, অপরিহার্য শর্ত। একইভাবে নাগরিক সমাজ, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, আইনজীবী, শিক্ষক, পেশাজীবী সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন একমাত্র পর্যবেক্ষক নয়; জনগণও একটি বড় পর্যবেক্ষক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশ যখন নির্বাচনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তখন জবাবদিহির পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নির্বাচনের একটি বড় বাস্তবতা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এটি যেমন স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সমর্থক এবং সাধারণ নাগরিক, সবারই দায়িত্ব তথ্য যাচাই করে প্রচার করা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু কারচুপি নয়; মিথ্যা তথ্যও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে বিপথে নিতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, জনগণ। একটি দেশের সংবিধান যত উন্নতই হোক, নির্বাচন কমিশন যত শক্তিশালীই হোক, ভোটাররা যদি নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার জনগণ যদি সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী হতে বাধ্য হয়। আজ বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। বহু বছরের বিতর্ক, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের পর একটি নতুন নির্বাচনী সংস্কৃতির সূচনা করার সুযোগ। এ সুযোগ ও দায়বদ্ধতা একা নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়, বরং সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সর্বোপরি জনগণের জন্যেও সুবর্ণ সুযোগ। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কখনো একদিনে ধ্বংস হয় না; আবার একদিনে পুনর্গঠিতও হয় না। এটি গড়ে ওঠে ছোট ছোট বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থেই অবাধ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে তার সুফল শুধু স্থানীয় সরকারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জনগণের মনে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি যে আস্থা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয়ে গেছে, তা পুনর্গঠনের একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি হবে। আর যদি সে সুযোগও হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি নির্বাচনের হবে না; ক্ষতি হবে গণতন্ত্রের; নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো তখন সত্যিই কঠিন হয়ে যাবে।