॥ তৌহিদুর রহমান ॥

প্রতিটা দিনের আলাদা একটা স্বপ্ন থাকে। থাকে অনুভূতি, থাকে বাস্তবতা। স্বপ্নকে ঘিরে বেঁচে থাকে আশা-ভরসা, প্রভাব প্রতিপত্তি, মর্যদা, মান-সম্মান, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা সব। মুহূর্তের এই স্বপ্ন মানুষকে পথ চলতে শেখায়। নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। মুহূর্তের এই স্বপ্নগুলোর আলাদা এক একটা সুখ থাকে। আলাদা একটা লক্ষ্য থাকে, থাকে ্আলাদা বৈশিষ্ট্য। থাকে রূপ, রস, গন্ধ। যেমন থাকে অন্য সব দিবসের। যেমন চৈত্রের আগুন-আকাশ, থমথমে হয়ে থাকে চারপাশ। রুক্ষ্ম বাতাস। গাছেরা নুয়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে। যেন দোযখের উত্তাপ তপ্ত দুপুরে। ঐ সময়গুলো অনেকের জন্য যেন মন খারাপের একটা মওসুম। মন খারাপের একটা লু হাওয়া কোথা থেকে আসে কে জানে! আবার কখনো মেঘযুক্ত বর্ষার আকাশ— মনটা গুমোট হয়ে থাকে। মানুষ কি ভেবে দেখে কখনো— এই যে রাত-দিন একই আকাশের নিচে পৃথিবী নামক একটি গ্রহের কন্দরে আমরা কাটিয়ে দিলাম অনেকটা সময়— কত আতর, কত সুখ, আশা, ভরসা, ভালোবাসা, ফেলে আসা সুগন্ধি রুমাল— রক্তসাগর, দুঃখ, কষ্ট, বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া আকাশ, আরও কত কি! স্মৃতিময় ফেলে আসা সেই দিনগুলো কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগে কারো কারো কাছে। আবার কারো কারো কাছে ধোঁয়ায় ধুসরিত গাঢ় অন্ধকার। আমরা কালো চাই না, আলো চাই। চাই সুবাসিত স্বপ্ন। একটা আলোকিত সিরাতুম মুসতাকিমের পথে এগিয়ে যেতে চাই আমরা। আমরা আর কত পেছনে যাব? আমরা যেতে চাই হেরার রাজ তোরণের পথে। যেখানে আলো আছে, শুধুই আলো। যেখানে কালো আর মন্দ আমাদের গ্রাস করবে না।

২০২৪-এর ফেলে আসা সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোর কথা আমরা কখনো যেন ভুলে না যাই— রক্ত, বারুদ, গুলি, আগুন, হত্যা, সন্ত্রাস। তাহলে আমাদের সব স্বপ্ন সত্যি সত্যিই ফেলানির মতো কাঁটাতারে চিরদিন ঝুলে থাকবে। আলোয় আলোয় আর হয়তো কখনো হাসবে না আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

আগুনের হলকার মতো একটা আওয়াজ ভাসতে থাকে বাতাসে, ইথারে ইথারে, একটা ঘোষণা আসতে থাকে লু হাওয়ার সাথে। চোখের সামনে যা কিছু দেখছো একদিন সব উধাও হয়ে যাবে স্বপ্নের মতো। চাঁদের আলোয় কতই না বিশাল দেখা যায় এই পৃথিবীকে, এমন এক সময় আসবে তখন স্মৃতির আয়নায় এই পরিচিত পৃথিবীটাকে অনেক ছোট মনে হবে। আনন্দের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিল যে জুলাই বিপ্লব, সময়ের বিবর্তনে তা আজ হয়তো মন খারাপের এবং প্রতারণার একটা ফানুস নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে বা হবে। তখন হয়তো কাউকে পাশে পাওয়া যাবে না। সব সময় স্মৃতির সাগর ডুব মেরে থাকে দিনের আলোয়। এমনকি সব স্মৃতিকেও মেঘ আড়াল করে রাখে। সাধারণত স্মৃতিতে থাকে বাস্তবতা বিবর্জিত আবেগ, যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। সমাজ-রাষ্ট্রকে খাদের কিনারে ফেলে দেয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবলমাত্র একটা চেতনা অর্জনের লড়াই ছিল না। এটা ছিল সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঘোষিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে (Proclamation of

Independence) সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারকে রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

সাম্য (Equality) অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার। বলা হয়ে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণ চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। এই বৈষম্য দূর করাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য।

ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মর্যাদা (Fraternity & Human Dignity) অর্থাৎ মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের আত্মসম্মান নিশ্চিত করা। আসলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি মানবিক সমাজ গঠন করাই ছিল ১৯৭১-এর মূল চেতনা।

মৌলিক মানবাধিকার (Human Rights) অর্থাৎ বেঁচে থাকার অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা। ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট ছিল মূলত মৌলিক মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। ১৯৭১ সালের এই আদর্শগুলোই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ তার উল্টো।

৭১-কে শুধুমাত্র স্মৃতি হিসেবে আমরা ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছি। একাত্তরের রূপ, রস, গন্ধ আমাদের বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। পারেনি মেহনতি মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনতে। শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে স্বপ্ন পূরণ হয় না। তাই ১৯৭১-কে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি আবেগের মিথ্যা ফানুস উড়িয়ে। শুধুমাত্র গালগল্প, কবিতা, উপন্যাস, সিনেমা, নাটক বানিয়ে আমরা ৭১-এর চেতনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছি। ফলে ১৯৭১-এর মহান আন্দোলন আমাদের বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। ১৭৭১ এখন শুধুই একটা চেতনার নাম।

আবার ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবকে যদি আমরা শুধুমাত্র গালগল্প, কবিতা, উপন্যাস, সিনেমা, নাটক, সঙ্গিতের মতো ফ্রেমে আটকে ফেলি, তাহলে আবারো আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হবে। আমাদের ভাবতে হবে মানুষ শুধুমাত্র স্বপ্নের জন্য রাজপথে জীবন দেয়নি। যেভাবে ১৯৭১-এর মহান আন্দোলন আমাদের বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। বর্তমান অবস্থা দেখে আমাদের মনে হচ্ছে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ঠিক একই পথ ধরে হাঁটছে।