জ্বালানি তেল নিয়ে নৈরাজ্য থামছেই না। গতকাল বুধবারও রাজধানী ঢাকার তেলের পাম্পগুলোর সামনে গাড়ি ও বাইকচালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তেল নিতে এসে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে রাইড শেয়ারিং বাইক চালকদের অনেকের দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা ও আয় অনেকটাই কমে গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার বিষয়ে সরকারের আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও, গতকাল সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও থেমে থেমে সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার মতো ঘটনা অব্যাহত ছিল।
চাহিদা সামাল দিতে এবং পাম্পগুলোতে চাপ কমাতে বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা জোড়-বিজোড় রেশনিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব দিলেও, সেগুলো এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পাশাপাশি প্রায়শই ‘তেল নেই’ নোটিশ দেখতে হচ্ছে।
এই চাপের মুখে বিপিসি ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে প্রতিদিন ১৩,০৪৮ টন ডিজেল, ১,৪২২ টন অকটেন এবং ১,৫১১ টন পেট্রল বিতরণ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও খুচরা পর্যায়ে পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি।
বাস্তবে, সরবরাহ বৃদ্ধির এই সুফল পাম্পগুলোতে জ্বালানির সহজলভ্যতায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশে অপেক্ষার সময় কিছুটা কমলেও, দেশের বেশিরভাগ এলাকার গাড়িচালকদের এখনো বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বন্দর ও বিপিসি সূত্র জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৩ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৬টি জাহাজে ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন জ্বালানি এসেছে। এর মধ্যে ১৬টি জাহাজে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৫২ টন ডিজেল, ছয়টিতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭ টন ফার্নেস অয়েল, দুটিতে ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন এবং দুটিতে ২১ হাজার ২৬৬ টন জেট ফুয়েল এসেছে। তা ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ৩২ হাজার টন ডিজেল এসেছে।
দৈনিক ১২,৫০০ টন জ্বালানি তেলের গড় চাহিদা হিসেবে ৫৩ দিনে আসা ডিজেল দিয়ে ৫০ দিনের চাহিদা মেটানো যেত। মার্চ মাসের শুরুতে দেশে ১২ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। আগে থাকা মজুদ ও নতুন আসা ডিজেল দিয়ে ৬৫ দিনের চাহিদা মেটানোর কথা ছিল। তার মানে দেশে ডিজেলের মজুদের কোনও ঘাটতি ছিল না।
মার্চের শুরুতে অকটেনের মজুদ ছিল ১৮ দিনের। এর মধ্যে দৈনিক গড় চাহিদা ১,২০০ টন ধরে ৫৩ হাজার টন আমদানি ধরে মোট ৪৫ দিনের মজুত থাকার কথা। স্থানীয় রিফাইনারিগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৭০০ টন হারে আরো ৩৭,০০০ টন বা ৩০ দিনের অকটেন পাওয়ার কথা। অর্থাৎ, প্রাপ্যতা দিয়ে মোট ৯৩ দিনের চাহিদা মেটানো যেত। অথচ, পরিসংখ্যানে উদ্বৃত্ত অবস্থা থাকা সত্ত্বেও খুচরা বা ভোক্তা-পর্যায়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘœ অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বুধবার বিকেল পাঁচটায় কথা হয় তুহিনের সঙ্গে। নিজের মোটরসাইকেলে তেল নিতে বেলা দুইটায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তিন ঘণ্টায়ও ফিলিং স্টেশনে ঢুকতে পারেননি।
ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান তুহিন। তেল নিয়েই তাঁকে ফিরতে হবে। তিনি বলেন, ‘তেল না পেলে তো আর সংসার চলবে না।’ দুপুরে রুটি-কলা খেয়েছিলেন, তারপর আর লাইন ছেড়ে খেতে যাননি। ‘এখন খাওয়ার চিন্তা করতে গেলে তেল পাব না,’ জানালেন তিনি। তেল নেওয়ার পরই খেতে যাবেন।
তেজগাঁওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গতকালও লাইন দীর্ঘই ছিল। তেলের জন্য ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি পৌঁছেছিল এক কিলোমিটার দূরে বিএএফ শাহীন স্কুলের বিপরীত পাশ পর্যন্ত। মোটরসাইকেলের লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল তার চেয়ে কম, প্রায় জাহাঙ্গীর গেটের কাছাকাছি পর্যন্ত। বিকেলে লাইনে প্রাইভেট কার ছিল ৫৩৭টি ও মোটরসাইকেল ছিল ৬৮৯টি। এ ছাড়া ৩৭টি ছোট পিকআপ ভ্যান, ১৬টি ছোট কাভার্ড ভ্যান ও ৩টি অ্যাম্বুলেন্সও ছিল তেলের অপেক্ষায়।
রাজধানীর পূর্ব প্রান্তের মাতুয়াইল থেকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে এসেছিলেন ভাড়ায় মোটরাইকেলচালক মো. নয়ন ইসলাম। দুপুর ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। লাইনে দাঁড়িয়েই দুপুরে শিঙাড়া আর রুটি খেয়ে নেন। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু তেলের জন্য এভাবে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর কাজ করা যাবে না।’
বনশ্রী এলাকা থেকে নিজের প্রাইভেট কারের জন্য তেল নিতে আসেন ব্যবসায়ী ইফতেখার মাহমুদ। বিকেলে তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো পাইনি।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ধানমন্ডি থেকে আসা গাড়িচালক মো. মোখলেসুর রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালান তিনি।
ট্রাস্টের মতো অতটা ভিড় দেখা যায়নি রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ফিলিং স্টেশন নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারে। দুপুরে সেখানে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা ছিল আগের দিনগুলোর তুলনায় কম।
সেখানে জ্বালানি তেলের জন্য ৭৭টি প্রাইভেট কারকে অপেক্ষায় দেখা গেছে। এ ছাড়া ১১২টি মোটরসাইকেল, ১৩টি ছোট পিকআপ ভ্যান, তিনটি ছোট কাভার্ড ভ্যান ও একটি বাসকে লাইনে দেখা গেছে বেলা একটায়।
নিজের মোটর সাইকেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন রাইডার রাকিব হোসেন। এর আগে শনিবার সর্বশেষ ৫০০ টাকার তেল নিয়েছিলেন তিনি। আজ আবার আসেন।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, ‘আগে যা তেল পেয়েছি, তা বুধবার শেষ হয়ে গেছে। সে জন্য এখন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। তেল পেলে আবারও বাইক চালাতে পারব। তেল না থাকলে তো আর বাইক চালানো যায় না, বাধ্য হয়েই কাজের সময়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি।