স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গণভোটের রায় কোনো সাধারণ পরামর্শ (অ্যাডভাইজারি) নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক ‘ম্যান্ডেট’ বলে মন্তব্য করেছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই ম্যান্ডেট একবার ভঙ্গ করলে ভবিষ্যতে কেউ আর গণভোটের মূল্য দেবে না।
গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে ‘সোসাইটি ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ (এসজেপি) আয়োজিত ‘জুলাই বিপ্লব ও বিচার বিভাগ: আমাদের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতন অনেক আগেই হতে পারত, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। যখন জাতীয় ঐক্য হলো, তখনই এটি সফল হয়েছে। জাতীয় ঐক্য হয়েছে বলেই আমরা এটাকে রেভোলিউশন (বিপ্লব) বলছি, নয়তো এটি বিদ্রোহ (রেবেলিয়ন) হতো।’
গণভোটের আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে যে গণভোটটি কেবল অ্যাডভাইজারি। কিন্তু সাংবিধানিক আইন ও নীতি অনুযায়ী, গণভোটের পর এটি আর অ্যাডভাইজারি থাকে না, এটি ম্যান্ডেট হয়ে যায়। একবার যদি এটি ভায়োলেট করা হয়, তবে ভবিষ্যতে নির্বাচিত হয়ে কেউ আর জনগণের রায় মানবে না।
তিনি আরও বলেন, জনগণ যখন ক্ষমতা ডেলিগেট করে, সেটি একটি আমানত বা ট্রাস্ট। যখন শাসক সেই ট্রাস্ট ভঙ্গ করে অপরেসর (নিপীড়ক) হয়ে যায়, তখন তাকে ডিসলজ (ক্ষমতাচ্যুত) করা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ও ডিউটি। জুলাই বিপ্লবে সেটিই হয়েছে।
বিপ্লবের অর্জন রক্ষায় আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবকে পলিটিসাইজ (রাজনীতিকরণ) করা যাবে না। এটি একটি ন্যাশনাল রেভোলিউশন। যারা রক্ত দিয়েছে, তাদের সম্মান রক্ষা করতে হলে এই বিপ্লবের সাকসেস রক্ষা করতে হবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব কোনো প্রচলিত সাংবিধানিক বিধি মেনে হয়নি, এটি ছিল ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিদ্রোহ।
তিনি আরও বলেন, ‘বিপ্লবের সময় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার নেতাকর্মী পর্যন্ত সবাই ভারতে পালিয়ে গেল। এটি একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলের ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’, যার দ্বিতীয় নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকে না, জনগণের অভিপ্রায়ই তখন প্রধান।’
রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে এখন যদি বলে ‘মানি না’, তবে সেটি হবে জনগণের সঙ্গে চরম প্রতারণা। ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে যায়নি কারণ ভোটের মূল্য ছিল না। এখন সংস্কারের জন্য দেওয়া গণভোটের রায় যদি না মানা হয়, তবে রিপাবলিকের ধারণা আর থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিএনপির ধ্বংস চাই না, বরং তারা সফল হোক এটাই চাই। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আইনজীবীদের উচিত হবে ঢাকায় কনভেনশন করে সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করা।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। এসজেপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাশেম আরমান, ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান প্রমুখ।
বক্তারা জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখতে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সব স্তরের আইনজীবীদের রাজপথে ও আইনি লড়াইয়ে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান।