কুষ্টিয়া জেলা সংবাদদাতা : কুষ্টিয়া জেলায় পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ২৮টি পয়েন্টে প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। ভাঙনের কবলে পড়ে চোখের পলকে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত হেক্টর তিন ফসলি জমি, ফলের বাগান এবং অসংখ্য বসতভিটা। একই সঙ্গে চরম হুমকির মুখে পড়েছে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং ভাঙন প্রতিরোধে এবার জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাশাপাশি ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধেও আইনি তৎপরতা শুরু হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরাসরি পরিদর্শনে যান কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান। তিনি দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ, কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান এবং প্রশাসনের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ভাঙনকবলিত কোলদিয়ার হাটখোলাপাড়া, মাজদিয়ার ও ভুরকা এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দুর্দশার কথা শোনেন এবং তাদের আশ্বস্থ করেন।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। এই অর্থ বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক কাজ পুরোদমে শুরু করা হবে। এছাড়া, শুধু সাময়িক সমাধান নয়, বরং স্থায়ী নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান জানান, পদ্মা নদীর ভাঙন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভাঙন প্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলার কাজ চলমান রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর আরও কার্যকরভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের একটি নতুন প্রস্তাব প্রস্তÍুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হওয়া এই দুর্যোগ থেকে মানুষকে বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

নদীভাঙনের এই তীব্রতার পেছনে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলনকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম রোধে এবং সেতু ও নদীর তীরবর্তী এলাকা বাঁচাতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া সড়ক পরিবহন ও সেতু সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, সেতু কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালকসহ ১৯ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

আইনজীবী গোলাম রহমান ভূঁইয়া তার নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীব্র ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভুরকা-হাটখোলা থেকে কোলদিয়ার পর্যš প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা, ভেড়ামারা উপজেলার ফয়জুল্লাপুর, মসলেমপুর, কুমারখালীর ঘোড়াইঘাট এবং খোকসা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকায় প্রায় ৫০ মিটার অস্থায়ী বাঁধ ধসে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভাঙন এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দিকে ধেয়ে আসছে।

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ব্যবহৃত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জাতীয় সঞ্চালন লাইন বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া রায়টা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, খোকসার শহররক্ষা বাঁধ, জুনিয়াদহ বাজার এবং হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও হুমকির মুখে।

নদীভাঙনের কারণে নদী ভরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়ার মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেকোনো সময় বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।

কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিলেও নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের চোখেমুখে এখনও শুধুই হারানোর আতঙ্ক।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রতি বছর জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকার যেন দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে টেকসই নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়। কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এ দাবি নদীপারের আপামর জনসাধারণের।