আলোচিত সংগঠক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিস্ফোরক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশটির হস্তক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত বলে করছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। তবে, এ ব্যাপারে বিএনপি সরকারের কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।

মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) কলকাতার ধর্মতলায় এক সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে আসা এক দুর্ধর্ষ খুনিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি আরও জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো নাম বলেননি, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা, এটি গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় নিহত আলোচিত সংগঠক ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত।

বক্তৃতার এক পর্যায়ে মমতা কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি।”

তবে তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে আনছেন না কারণ এতে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ উত্তাল হয়ে যাবে—আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি।”

এই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘তার কথা থেকে বোঝা যায় যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আধিপত্যবাদী চিন্তা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে, এটি তারই প্রমাণ।’ তিনি আরও জানান, সরকারের উচিত এই বক্তব্যের সূত্র ধরে ভারত সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন মনে করেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের এখনই দিল্লির কাছে জবাব চাওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে খুনিরা দ্রুত ভারতে আশ্রয় পেল। তার মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য এই রহস্যের জট খুলতে সহায়তা করতে পারে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে লক্ষ্য করে এসব কথা বলেছেন, যা নিয়ে বাংলাদেশের মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যেহেতু ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম এখানে সরাসরি এসেছে, তাই বাংলাদেশ সরকার একটি ব্যাখ্যা চাইতে পারে।’ তবে তিনি মনে করেন, প্রমাণ ছাড়া এই বক্তব্যের ভিত্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক ওসমান হাদি। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই অভিযুক্তকে গত মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ গ্রেপ্তার করে।