জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)-এর আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেছেন, “একাত্তরের আকাঙ্খা বেহাতের মাস্টারমাইন্ড শেখ মুজিব, আর চব্বিশের আকাঙ্খা বেহাতের মাস্টারমাইন্ড ‘অনেকগুলো ছায়া মুজিব’। এসব কথিত মাস্টারমাইন্ডদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে দেশ বিনির্মাণের দায়িত্ব মুক্তিকামী জনতার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।”
মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে জেডিপি আয়োজিত “জনযুদ্ধ থেকে গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও নতুন ধারার রাজনীতি” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাঈম আহমাদ বলেন, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণের সময় শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থেকেও তিনি অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি হন। মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পর তিনি দেশে ফিরে নেতৃত্বে আসীন হন।
তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর মুজিবনগর সরকারের তিন মূলনীতি—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে গণতান্ত্রিক ধারার পরিবর্তে একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত করেন।
জেডিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ফ্যাসিবাদের বিলোপ, নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তার ভাষায়, “অনেকগুলো ছায়া মুজিব সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করে পুরোনো রাজনৈতিক ধারাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।”
তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদ শব্দটির অনুবাদ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট দলকে দাঁড় করানো হয়েছে; অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মধ্যেও ফ্যাসিবাদী চরিত্র বিদ্যমান।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্লোগানধারীরা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করেছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো স্তরেই বৈষম্য হ্রাস পায়নি।
নাঈম আহমাদ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে এবং দুর্নীতির অর্থ ব্যবহার করে ‘কিংস পার্টি’ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও অনেকে পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেছেন। “এরা প্রত্যেকেই একেকজন ‘ছায়া মুজিব’,”—যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সামাজিক গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে হলে এসব সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে।
আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে সামাজিক গণতন্ত্র একটি অপরিহার্য উপাদান উল্লেখ করে নাঈম আহমাদ আরও বলেন, পরবর্তী গণআন্দোলনের আগে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক অবস্থান সুসংহত করা জরুরি। নতুন ধারার রাজনীতির আলোকে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি না হলে পরিবর্তন কেবল স্লোগাননির্ভর রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে। বারবার কথিত মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা বিপ্লব বেহাত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, সংবিধান পরিবর্তনের নামে নতুন কোনো গণবিরোধী কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সভায় মুজিবনগর সরকারের প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের একটি স্মৃতিচারণও পাঠ করা হয়। যেখানে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “এ দেশে সব স্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি দেখেছি, জেনেছি, প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা পেয়ে গ্রেপ্তার বরণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতারা কলকাতায় কামড়াকামড়ি করেছেন ওই সময়টিতে। এমপি সাহেবদের মুজিবনগর সরকার মাসিক ভাতা দিত। তাঁদের নীতিনৈতিকতাহীন জীবনযাপনের নানান খবর চাউর হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে তাঁরা একঘরে করে রেখেছিলেন। যুদ্ধের ঝাপটা গেছে অবরুদ্ধ দেশের কোটি কোটি মানুষের ওপর দিয়ে। সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানত পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং গ্রামের তরুণেরা। যদিও মুক্তিযুদ্ধের ফসল ছিনতাই করে নিয়েছিল একটি দল, একটি পরিবার। মুক্তিযুদ্ধের চাপিয়ে দেওয়া বয়ান বেশি দিন আর টেকানো যাবে না।”
সভায় জেডিপির প্রধান সংগঠক মোঃ আহছান উল্লাহর সঞ্চালনায় আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় যুগ্ন সদস্য সচিব এডভোকেট সাদ্দাম হোসেন, মাহতাব হোসেন সাব্বির, ইঞ্জিনিয়ার আয়মান আন্দালিব, ইয়াসিন আরাফাত রাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য জহিরুল ইসলাম অমি, সালমান শরীফ, সৈয়দ মাশরুর জিসান, আরিফুল হক চৌধুরী প্রমুখ।