বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও অবাধ হয় এবং কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং না হয়, জনগণ যদি স্বাধীনভাবে তাদের রায় দিতে পারে; তাহলে আগামী দিনের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হবেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
রোববার (২৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন রচিত ‘জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা, মানবিক ঢাকার পুনর্গঠন’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং ২৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী নগর পরিচ্ছন্নতা অভিযান উপলক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞ। জনগণের পাশে থাকা, রাজনীতি করা, মাঠে কাজ করার পাশাপাশি পড়ার টেবিলে বসা, কলম ধরা এবং চিন্তা করে সেই চিন্তাকে বইয়ের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরা—এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের লেখা বইটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস বইয়ের পাতায় তুলে ধরা অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের সন্তানেরা বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গড়ার জন্য জীবন দিয়েছেন, কঠিন সংগ্রাম করেছেন। ইতিহাসের পাতায় এমন সর্বজনীন আন্দোলনে মানুষের এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা বিরল।
তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুতে কোন রাজনৈতিক দল বা কে এই আন্দোলনের নেতা—তা কেউ বুঝতে পারেনি। কিন্তু আন্দোলনের শেষ দিনগুলোতে এটি উত্তাল রূপ ধারণ করে। রাজধানী ঢাকা তখন উত্তাল হয়ে ওঠে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “কারা এই আন্দোলনের বীজ বপন করেছিলেন, কারা এই আন্দোলনের ডিজাইন করেছিলেন—আমরা সেসব কথা বলে কৃতিত্ব নিতে চাই না।”
জুলাই আন্দোলনের সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের লেখার মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংগ্রামী আমিরের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। ১৭ জুলাই হজ থেকে দেশে ফিরেই তিনি কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে হাল ধরেছিলেন এবং আন্দোলনের বিষয়ে ধারাবাহিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন, বইটিতে তা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সেই ইতিহাস ছোট হলেও সত্যি। সেই ইতিহাস তিনি তার লেখার মধ্যে তুলে ধরেছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আজ দুঃখের সঙ্গে শুনতে হয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন যে ১৭ বছর নাকি তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “কোথা থেকে তিনি গুপ্ত-সুপ্ত শব্দ আবিষ্কার করলেন? কীভাবে তারা আমাদের খুঁজে পাবেন? কারণ আমরা তো ময়দানে ছিলাম।”
তিনি বলেন, “টেলিভিশনে তো আপনি দেখবেন না। কারণ আমরা রাজপথে ছিলাম, কারাগারে ছিলাম, রিমান্ডে ছিলাম। লড়াইয়ের ময়দানে জীবনকে বাজি রেখে রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে, অ্যাম্বুলেন্সে জনগণকে মোটিভেট করে লড়াইয়ের ময়দানে ছাত্র-জনতাকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। আপনি আমাদের কী করে দেখবেন?”
তিনি আরও বলেন, “আর আপনাদেরকেও আমরা দেখেছি। মিটিং হচ্ছে, স্লোগান হচ্ছে—‘আমরা সবাই অমুক সেনা, ভয় করি না বুলেট-বোমা’। আর চট করে একটা ককটেল আসলো, পিছনে দৌড়। সেগুলো আপনারা দেখেন না, খালি আমাদেরকে দেখেন।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও অবাধ হয় এবং কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং না হয়, জনগণ যদি তাদের রায় দিতে পারে, তাহলে আগামী দিনের ঢাকা উত্তরের মেয়র হবেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, দেশ যদি মানবিক হয়, দেশ যদি বৈষম্যহীন হয়, তাহলে ঢাকাকেও মানবিক ও বৈষম্যহীন করতে হবে। রাজধানী ঢাকা দেশের রাজধানী, একই সঙ্গে রাজনীতিরও রাজধানী। এই জায়গাকে সুন্দর করা এবং এখানকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে নগরকে মানবিক করতে পারলে বাংলাদেশের অন্যান্য নগরও ঢাকা থেকে মডেল ও শিক্ষা গ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে গোটা দেশকে একটি মানবিক ও আদর্শ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার পথ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা মানবিক ঢাকার পুনর্গঠন’ বইটি জুলাইয়ের ওপর কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা নয়। ১৭ জুলাই থেকে আমীরে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের কিছু মৌলিক বিষয় তিনি বইটিতে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, “এখানেও পূর্ণাঙ্গ বিষয় তুলে ধরতে পারিনি। হতে পারে এর ধারাবাহিকতায় আমি আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারব।”
নিজের মেয়র প্রার্থিতার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, গত এক দশক ধরে ঢাকা মহানগর থেকে তাকে জামায়াতে ইসলামীর মেয়রপ্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকেই তাকে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে পরিচয় করানো হচ্ছে। তখন থেকেই তিনি ঢাকাকে নিয়ে স্টাডি করতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, “বাস্তবেই যদি আমাকে এমন মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে ঢাকাকে আমি কেমন করে দেখতে চাই—তার কিছু আলোচনা ও বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রচনায় আমি আমার বইয়ে কিছু লিখেছি।”
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জানান, মূলত ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি যেসব লেখা লিখেছেন, সেগুলোকে বইটিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, “আমাকে যদি এই নগরের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে আমি এই নগরকে পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত নগরের আদলে বা তার চেয়েও নতুনত্বের মাধ্যমে সমৃদ্ধ, স্মার্ট ও আধুনিক এক নগর গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।”
অনুষ্ঠানে একই সঙ্গে ২৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী নগর পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার বিষয়ে ব্রিফিং দেওয়া হয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবের আ. সালাম হলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ব্যারিস্টার শাহারিয়ার কবির, মুফতী মাওলানা আলী হাসান উসামা, ড. ফয়জুল হক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মূসা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাত ও প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।