আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, রাষ্ট্রপক্ষের জোরজুলুম এবং কারসাজি করা হয়েছিল; যা ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সাক্ষীদের ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের মাধ্যমে আইনিভাবে সামনে এসেছে।
সাক্ষ্য আইন পরিবর্তন ও শিথিলকরণ
ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় প্রচলিত 'বাংলাদেশ সাক্ষ্য আইন ১৮৭২' (Evidence Act) এবং 'ফৌজদারি কার্যবিধি' (Crims of Criminal Procedure) সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করা হয়নি।আইনি পরিবর্তন: আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালকে প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে যেকোনো ধরণের প্রমাণ ও "শোনা কথা" (Hearsay evidence) গ্রহণ করার অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়।প্রভাব: এর ফলে মূল সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে অন্য কারো বয়ান বা পত্রপত্রিকার কাটিংকেও সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা সাধারণ ফৌজদারি আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ভয়ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাঈদীর মামলার তিন জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী (মাহবুবুল আলম হাওলাদার, মাহতাব উদ্দিন এবং আলতাফ হাওলাদার) ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার ১ নম্বর সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তারা ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করেন যে, সাঈদীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ না দেখলেও স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ভয়ে তারা সাজানো জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন।
তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন দল সাক্ষীদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের জন্য নির্ধারিত 'সেইফ হোম'-এ আটকে রাখত। ভুক্তভোগী সাক্ষীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকাসহ বিভিন্ন 'সেইফ হোমে' নিয়ে তাদের মাসের পর মাস অবরুদ্ধ রাখা হয়। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তারা ডেমো বা মহড়ার মাধ্যমে কোনো কোনো ঘটনায় সাঈদীর নাম জড়াতে হবে তা অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ করাতেন। কেউ অস্বীকৃতি জানালে বা সাঈদীকে নির্দোষ বললে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হতো।
পক্ষের (সাফাই) সাক্ষীকে আদালত গেট থেকে অপহরণ
সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ও কলঙ্কজনক ঘটনা ছিল পিরোজপুরের সুখরঞ্জন বালী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। সুখরঞ্জন বালী শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের (Prosecution) সাক্ষী হলেও তিনি সাঈদীকে নির্দোষ দাবি করে বিবাদী বা সাফাই (Defense) পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি হন। ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর তিনি যখন সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাক্ষ্য দিতে প্রবেশ করছিলেন, তখন তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে আদালত গেট থেকে অপহরণ করা হয়।
তৎকালীন সময়ে সরকার এটি অস্বীকার করলেও, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (DB) তদন্তের ভিত্তিতে সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (ASP) ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে প্রমাণিত হয়, ফজলুর রহমান নিজেই বালীকে থাপ্পড় মেরে শার্টের কলার ধরে ডিবির গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন।
বালীকে প্রায় দুই মাস বাংলাদেশের গোপন বন্দিশালায় (আয়নাঘর সদৃশ অন্ধকার কক্ষে) নির্যাতন করার পর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) কাছে পুশ-ইন বা হস্তান্তর করা হয়। সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে বালী ভারতের কলকাতার দমদম কারাগারে ৫ বছর বন্দি জীবন কাটান এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসেন।
এই সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাফাই সাক্ষীকে গুম করা এবং সেইফ হোমে আটকে রেখে ভুয়া জবানবন্দি তৈরি করার বিষয়গুলো সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনরায় আইনি তদন্তের মুখোমুখি।
বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়া
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড ও ফেয়ার ট্রায়াল (সুষ্ঠু বিচার) নীতিমালার গুরুতর লংঘন করে । ফলে এটি আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়। জাতিসংঘ (UN), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো এই বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আদালতটির নাম 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' (ICT) হলেও এটি কোনো আন্তর্জাতিক (যেমন: সিয়েরা লিওন বা কম্বোডিয়ার মতো জাতিসংঘের সহায়তাপুষ্ট) আদালত ছিল না। এটি ১৯৭৩ সালের একটি দেশীয় আইনের (ICT Act 1973) ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে রোম সংবিধির (Rome Statute) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি।
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম এবং ব্রাসেলস প্রবাসী এক আইনি বিশেষজ্ঞের (আহমেদ জিয়াউদ্দিন) মধ্যকার স্কাইপ কথোপকথন ও ইমেইল ফাঁস হয়। যাতে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সাময়িকী The Economist-এ প্রকাশিত এই কথোপকথন থেকে জানা যায় যে, রায় দ্রুত দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিচারকের ওপর চাপ ছিল এবং ট্রাইব্যুনালের বাইরের ব্যক্তিরা আদেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছিলেন। এই কেলেঙ্কারির জেরে বিচারপতি নাসিম পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা পুরো বিচার প্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি ও নিরপেক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিচারপতি নাসিমের পদত্যাগের পর নতুন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হলেও সাঈদীর মামলার পুনর্বিচার (Retrial) করা হয়নি। নতুন বিচারক পূর্ববর্তী বিচারকদের নেওয়া সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই রায় ঘোষণা করেন। [Human Rights Watch (HRW) তখন এক বিবৃতিতে জানায়, একজন নতুন বিচারক মূল সাক্ষীদের জবানবন্দি ও তাদের শরীরী ভাষা (Demeanor) সরাসরি না দেখে রায় দেওয়া আন্তর্জাতিক ফেয়ার ট্রায়াল নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক আইনি পর্যবেক্ষকদের মতে, সাঈদীর আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ডিফেন্স টিমকে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ বিপুলসংখ্যক সাক্ষী হাজির করার সুযোগ পেলেও, ডিফেন্সের সাক্ষীর সংখ্যা আদালত কর্তৃক কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছিল। আসামিপক্ষের বিদেশি আইনজীবীদের (যেমন: ব্রিটিশ আইনজীবী [টবি ক্যাডম্যান] বাংলাদেশে এসে মামলায় অংশ নেওয়ার অনুমতি চাইলেও দেওয়া হয়নি।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অপর এক নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের পর ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন শুরু হলে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তড়িঘড়ি করে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে। সংশোধিত আইনে রাষ্ট্রপক্ষকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয় (যা পূর্বে ছিল না)। [অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই আইন সংশোধনের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিল, কোনো নির্দিষ্ট চলমান মামলাকে প্রভাবিত করতে বা ফাঁসি নিশ্চিত করতে আইন পরিবর্তন করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণার দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩) দেশজুড়ে তীব্র সহিংসতা ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্বল আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হস্তক্ষপের কারণে এটি একটি 'ত্রুটিপূর্ণ বিচার' হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।