বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদের ২য় সাধারন অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আ ন ম শামসুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শ্রমজীবী। দেশের গুণগত পরিবর্তন ও উন্নয়নে এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। তাই শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) মগবাজার আল-ফালাহ মিলনায়তনে ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদের ২য় সাধারন অধিবেশনে কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান-এর সভাপতিত্বে এবং সাধারন সম্পাদক লসকর মো. তসলিম-এর সঞ্চালনায় কোরআন থেকে আলোচনা পেশ করেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, কবির আহমদ, মুজিবুর রহমান ভূঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
প্রধান অতিথি আ ন ম শামসুল ইসলাম বলেন, মানুষকে একদিন মৃত্যুবরণ করে পরকালে যেতে হবে। তাই দুনিয়ায় যতদিন বেঁচে থাকা যায়, ন্যায়-নীতি ও আদর্শের ওপর অটল থাকতে হবে। পরকালে প্রত্যেককে নিজের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন মানুষকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করার জন্য। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে ঐক্যবদ্ধ করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আমরাও শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ন্যায়, আদর্শ ও ইসলামের ভিত্তিতে সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছি।
১৫ আগস্ট শহীদ আবদুল মালেকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার কারণে আবদুল মালেককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী শক্তির হাতে তিনি শহীদ হন। তাঁর মতো বহু মানুষ ইসলামি আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে দেশে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। অতীতে মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হলেও আদর্শের সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শ্রমিকদের ত্যাগ ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব সেক্টরে মজুরি পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আট ঘণ্টা কর্মদিবস ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলার মানুষ কম। ৫ আগস্টের পর শ্রমিকরা পরিবর্তনের আশা করেছিল। শ্রম সংস্কার কমিশন বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দিলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বর্তমান বাজেটেও শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নেই।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সে অনুযায়ী বাড়েনি। পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন। তাই পোশাকসহ সব খাতে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্গঠন করতে হবে।
সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড ও বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা বন্ধে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হলেও অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইম দেওয়া হয় না। কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টায় নির্ধারণ ও নারী শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রম সেক্টরে একটি শ্রেণির আধিপত্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গার্মেন্টস ও পরিবহনসহ কোনো খাতকে একটি গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি করা যাবে না। শ্রম সেক্টরে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকৃত শ্রমিকরা ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অবিলম্বে এ হয়রানি বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সৎ, দক্ষ ও প্রকৃত শ্রমিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।