বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি রক্তাক্ত জুলাইয়ের ইতিহাস ভুলতে বসেছে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে ৩৬ জুলাই নিয়ে বিএনপির দলীয় কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি জুলাইকে অস্বীকার করেছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী, যাকে জনগণ সর্বমন্ত্রী নামে চেনে, সেই সর্বমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বিএনপি সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে কেবলমাত্র নির্বাচন আদায় করার জন্য। কারণ সংস্কারের দাবিতে যদি জনগণ আবার রাজপথে নামে তাহলে নির্বাচন হবে না। আর নির্বাচন না হলে তিনি ক্ষমতায় বসতে পারবেন না। এই যে জনগণের সাথে দ্বিচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতা— এতেই বোঝা যায় বিএনপি জুলাই চেতনা লালন ও ধারণ করে না, বিশ্বাস করে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে (০৩ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী কাজলা ব্রিজের সামনে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, দুনিয়ার ইতিহাসে এমন বর্বরতা কোথাও নেই যে নিজ দেশের জনগণকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকতে চায়। আমরা সেই নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ভুলতে পারি না। হাসিনার পেটুয়া বাহিনী যেভাবে গুলি করে মানুষকে হত্যা করেছে! হত্যার পর লাশ আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে! তিনি প্রশ্ন রাখেন, এত মানুষ কেন জীবন দিল, কেন পঙ্গুত্ববরণ করল?— কারণ মানুষ চেয়েছে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও রাষ্ট্রের পরিবর্তন হোক। মানুষ ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি। মানুষ চেয়েছে সিস্টেমের পরিবর্তন। মানুষ চেয়েছে বৈষম্যহীন একটি কল্যাণ ও মানবিক রাষ্ট্র। মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষার বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে রাষ্ট্র কাঠামোর সংশোধন নয়, সংস্কার করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতেই হবে। বিএনপি সংস্কার ইস্যুতে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে, সেই সংকট বিএনপিকেই নিরসন করতে হবে। সংসদে এর নিষ্পত্তি না হলে যে ৭০ ভাগ জনগণ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে, সেই ৭০ ভাগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে ফয়সালা করবে।
সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল, খুন, লুটপাট, দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে না পারায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিব ও এলজিইডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, ক্ষমতা গ্রহণের ৫ মাসেও সরকার কোনো কিছুর পরিবর্তন করতে পারেনি। সবকিছু আগের মতোই চলছে! বিএনপির মহাসচিবের এমন স্বীকারোক্তির জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের উচিত ব্যর্থতার দায় নিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে বিদায় নেওয়া।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, জুলাই বিপ্লব হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। জুলাই বিপ্লব আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য হয়নি।
তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা কীভাবে ক্ষমতায় এসেছেন সেটি আপনারাও জানেন, আমরাও জানি, দেশবাসীও জানে। সুতরাং দলীয়করণ বাদ দিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষমতায় থাকতে চাইলে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুবা আবারও দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হবে।
সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একটি দলকে বিদায় করে আরেকটি দলকে ক্ষমতায় আনতে জুলাই বিপ্লব অর্জিত হয়নি। জুলাই বিপ্লব অর্জিত হয়েছে সিস্টেমের পরিবর্তন ও রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য। কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার পরিবর্তে আবারও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হচ্ছে। এতে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার পরিবর্তে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের কথা বলে জাতিকে আবারও ধোঁকা দিতে যাচ্ছে। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে কীভাবে পালাবেন সেই পথ তৈরি করুন।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জুলাই মানে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ, জুলাই মানে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেওয়া, জুলাই মানে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য হাজার হাজার তরুণ ছাত্র, যুবক, শিশু-কিশোর এবং নারী জীবন দিয়েছিলেন। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে বিএনপি পুরোনো ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করেছে। বিএনপি গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের দুই বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত জুলাই শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করা হয়নি। তাঁদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি গণহত্যাকারীদের বিচার করা হয়নি। জুলাই চেতনা ও আকাঙ্ক্ষায় রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণহত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে তিনি সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক ও মব কালচার এবং দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা বেঁচে থাকতে দ্বিতীয় কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম আর হবে না।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের জন্য গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুবা আবারও জুলাই ফিরে আসতে পারে উল্লেখ করে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, জুলাই ফিরে আসলে ক্ষমতা রক্ষা করা যাবে না।
মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন খান এবং কর্মপরিষদ সদস্য কামরুল আহসান হাসানের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন, শহীদ আসলামের বোন শারমিন আক্তার, শহীদ নুর হোসেনের মা ছিনু বেগম, আহত জুলাই যোদ্ধা মো. শাহ আলম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যাত্রাবাড়ী জোন সহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান খান, ডেমরা জোন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলী, কদমতলী মধ্য থানা আমীর মো. মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম, যাত্রাবাড়ী মধ্য থানা আমীর অ্যাডভোকেট এ. কে. আজাদ প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির বলেন, জুলাইয়ের দিনগুলোতে একদিকে মসজিদে আজান হচ্ছে, আরেকদিকে রাস্তায় পুলিশের গুলিবর্ষণ চলছে। পুলিশের গুলির শব্দে আজানের ধ্বনি বিলীন হচ্ছিল। মানুষ আজানের ধ্বনিও শুনতে পায়নি। এত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও মানুষ পিছু হটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোটের রায় মেনে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে যাত্রাবাড়ীবাসী চব্বিশের জুলাইয়ের মতো আবারও একতাবদ্ধ হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাবে।