জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। ট্রানজিশনাল পিরিয়ডের সরকার হিসেবে তাদের একটি পবিত্র দায়িত্ব ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরটিকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা। কার্যত তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির মধ্যে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেন হয়নি তা পরিষ্কার। নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে দেয়া হয়নি। ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার মুখ থেকে তা বের হয়েছে। তিনিই প্রথম রাজসাক্ষী।

আজ ১৭ এপ্রিল (জুমআ বার) সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকাস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগরী আমীর সম্মেলনে তিনি উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

দেশবাসীর উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অধ্যাপক ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে একটি বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হতে পারে বলে জানান। আমরা এটির প্রতিবাদ করেছিলাম যে, বিদেশের মাটিতে বসে দেশের নির্বাচনের তারিখ কেন ঘোষণা করা হবে? দ্বিতীয়ত, বিএনপি একমাত্র স্টেকহোল্ডার নয়। সেসময় দেশে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল। আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম তিনি জাতিকে একটি ভুল বার্তা দিয়ে এসেছেন।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীরগণ, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলবৃন্দ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং সাংগঠনিক ৭৯টি জেলা ও মহানগরীর আমীর সেক্রেটারিগণ উপস্থিত ছিলেন।

আমীরে জামায়াত উদ্বোধনী বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের শহীদের মর্যাদা ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেন। এছাড়াও যারা জেল জুলুম নির্যাতন ও আয়নাঘরের শিকার হয়েছেন, যাদের জান মাল ও ইজ্জতের উপর আঘাত হয়েছে, তাদের প্রতিও জামায়াতের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি উল্লেখ করেন, শুধু চব্বিশের জুলাই নয় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে এদেশে সন্ত্রাসের কবলে পড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন শীর্ষ দায়িত্বশীল নেতাসহ আমাদের সহস্রাধিক কর্মীকে হারিয়েছি। অন্যান্য বিরোধী দল ও মতের উপর একই তাণ্ডব চালিয়েছি ফ্যাসিবাদী সরকার।

তিনি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাই নয়, বরং সরকারেরই একজন প্রতিমন্ত্রী বলে ফেলেছেন যে, আন্দোলন করেছে যুবসমাজ, আমরাও ছিলাম। তবে প্রফেসর ইউনূস যুক্তরাজ্যে গিয়ে ক্যাপ্টেনের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছেন। ট্রফি যদি ওখানেই তুলে দেয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজন কি? এটি দ্বিতীয় রাজসাক্ষী। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে নির্বাচনে যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম করে জনগণের প্রত্যাশার কবর রচনা করা হয়েছে।

আমীর জামায়াত বলেন, দুটি ভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৃথক ব্যালটে। একটি ছিল জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন, আরেকটি হলো গণভোটে হ্যাঁ কিংবা না। জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। গণভোটে ৬৮% -এর বেশি হ্যাঁ-তে ভোট দিয়েছেন জনগণ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন তাদের আমরা মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। তাদের ১৬৮টি পাওয়ার কথা ছিল তাদের আমরা ৬৮টিতে বেঁধে দিয়েছি। এটি চরম লজ্জাজনক, বলেন ডা. শফিকুর রহমান।

আমীরে জামায়াত বলেন, ইতিহাস একদিন এই নির্বাচনের পোস্টমর্টেম করবে। সেদিন চুলচেরা আরও অনেক জিনিস বের হয়ে আসবে। তবে আমাদের ঐক্য (১১ দল) দেশ পরিচালনার জায়গায় গেল কিনা সেটি বড় আফসোসের জায়গা নয়, জনগণের আকাক্সক্ষার মৃত্যু হলো। আমরা চাইনি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। এই নির্বাচন শেষ নির্বাচন নয়, এই মার্কা নির্বাচন ২০০৮ সালে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বোঝাপড়া করে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি বহন করে বিদায় হয়েছে। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়- তা প্রমাণিত, কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহ তায়ালা।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের আফসোসের জায়গা হলো জনগণের ভোটাধিকার আর কতকাল চোরাবালিতে হামাগুড়ি খাবে। আমরা আশাবাদী, অপসংস্কৃতির অপনোদন হবে। সুস্থ রাজনীতির বিকাশ ঘটবে। আমরা সেই সুস্থ রাজনীতির ধারায় হাঁটছি বলেই এতো বড় দলীয় বা জোটগত ক্ষতি আমরা মেনে নিয়েছি বৃহত্তর স্বার্থে। আরেকটি আফসোস হলো আমরা প্রথম দিনে দুটি শপথ নিলেও সরকারি দল একটি নিয়েছে। আমরা প্রতারণা ও ধোকাবাজির রাজনীতিকে প্রত্যাখান ও ঘৃণা করি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময় সীমা ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন ও সংস্কার পরিষদের অধিবেশ না ডাকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

আমীরে জামায়াত বলেন, সংকট বিএনপ সংসদ সদস্যদের শপথ না নেয়ার মধ্যদিয়ে সূচনা এবং সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকার মধ্যদিয়ে তার ষোলোকলা পূর্ণ করা হয়। মার্চের ১২ তারিখ সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়। সময় স্বল্পতার মধ্যে বিরোধীদল সংসদে নোটিশ উত্থাপন করলেও তা টকডআউট করা হয়, যা স্পিকারের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ণ করে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি আরও বলেন, জনগণের রায়কে অস্বীকার, অগ্রাহ্য অমান্য করার ধারা শুরু হয়, এরপর থেকেই চলছে। অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিগত সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছিল। ৩০ দিনের মধ্যে এটি নিষ্পত্তি করতে হবে। যে যে জায়গায় সংবিধানের বর্তমান অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্য অধ্যাদেশ জারি হয়েছে- সেই জায়গাগুলো বিএনপি বদলাতে চায় না। অর্থাৎ ঐ জায়গাগুলো রেখে দিয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় হয়তো তারা দেশ চালাতে চায়। আমাদের লোকেরা তখন নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

আমীরে জামায়াত আরও বলেন, আমরা বলেছিলাম ১৩৩টি অধ্যাদেশে সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এটা সংসদের প্রপার্টি, এটা সংসদেই আলোচিত হতে হবে। কিন্তু শেষ দিন দেখা গেল এখানে কাটছাট করে আমাদের সামনে আলোচ্যসূচি দেয়া হয়েছে। আমরা তখন বাধ্য হয়ে আবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করি। আমরা বলেছিলাম গণভোটকে বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের কাছে গিয়েছিলাম। আমরা আবার জনগণের এজেন্ডা নিয়ে জনগণের কাছে চলে যাচ্ছি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে একটা সরকার গঠিত হয়েছে। বিশ্বে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশও আর্থিক ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হোক- তা আমরা চাইনি। আমরা আন্দোলন সংগ্রামের দিকে যাবো এতে জনদুর্ভোগ বাড়বে, আমরা এটা চাইনি। কিন্তু আমাদের যখন সংসদে ন্যায্য বিষয়ে কথা বলতে দেয়া হবে না, তখন আমাদের জায়গা থাকে রাজপথ। কারণ আমরা জনগণের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে ঢুকেছি।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা বুঝি এ দেশের জনগণ সতর্ক। কারো বাবা হারিয়েছে কারো ছেলে হারিয়েছে, কারো ভাই হারিয়েছে। তারা দেখছে কে কি করছেন আর কে কি বলছেন। জনগণের সামনে সব পরিস্কার। আমরা জনগণের এজেন্ডা নিয়ে এখন জনগণের সাথে কাজ করি। সংসদেও আমরা যখন সুযোগ পাবো তখন আমরা ন্যায্য কথাগুলো জনগণের জন্য বলতেই থাকবো।

তিনি বলেন, ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কার্যত জনগণকে অপমান করেছে সরকার। বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও রেফারেন্ডাম এভাবে বৃথা যায়নি। বাংলাদেশে চারটি রেফারেন্ডাম হয়েছে- এটা চতুর্থ। চতুর্থটাও বিএনপির হাতে। জিয়াউর রহমান যে গণভোট করেন সেই প্রথমটাও সংবিধানে ছিলো না। শেষটাও সংবিধানে ছিলো না। ওটা যদি জায়েজ হয় তাহলে এটা জায়েজ হবে না কেন? প্রশ্ন রাখেন আমীর জামায়াত। এটা মনের মতো হয়নি এজন্য এটা নাজায়েজ। এখন আবার এটা ফ্যাক্ট টার্ম ভ্যালিড, বলেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব অধ্যাদেশ আকারে এসেছিলো। তারমধ্যে ছিলো দুদক: দুদকের নিয়োগটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে রেখে উপযুক্ত দক্ষ, নিরপেক্ষ লোক এনে এখানে বসানো। সেটা ওনারা তুললেন না, আটকিয়ে দিলেন। এরপর মানবাধিকার : এখানে একটু সামান্য আলোচনা করে এটাকে জোর করে পাস করিয়ে নিলেন। পুলিশ সংস্কার কমিশন: পুলিশে অনেক সংস্কার প্রয়োজন। স্বয়ং পুলিশ পুলিশের হাতে নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তারা বৈষম্যের শিকার। এ সবগুলো বিষয় সেখানে ছিলো। গুম কমিশন, গুম প্রতিরোধ আলোচনায় আনা হলো না। এই গুমের শিকার লোকেরাই তো এখন সংসদে সদস্য হয়ে এসেছেন। কেউ সাড়ে ৮ বছর, কেউ ৪ মাস। এ রকম লোকেরা এখানে আছেন। আমার গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখানে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। জোর করে এটাও ফেলে দেয়া হলো। তার মানে কি আবার গুম হবে? তার মানে কি আবার নতুন করে আয়নাঘর তৈরি করা হবে? প্রশ্ন রাখেন বিরোধী দলীয় নেতা।

ব্যাংক সংস্কার নিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, ব্যাংক সংস্কারের জন্য ব্যাংক রেজুলেশন। ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেল। এগুলো আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশ ছিলো। সেটা বাদ দেয়া হলো। কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এখন ব্যাংকের উপর থাবা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনরকে অপদস্ত করা ও একজন ঋণখেলাপিকে গভর্নর পদে বসানোর সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকের মালিক দেশবাসী, কোনো দল নয়। সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে, গর্জে উঠতে হবে। আপনার আমানত আপনাকে রক্ষা করতে হবে। জনগণের সাথে থাকার ঘোষণা দেন ডা. শফিকুর রহমান।

আমীরে জামায়াত বলেন, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক আদলে রেখে যতসব অবিচার করা হয়েছে, জুডিসিয়াল কিলিং করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং আমাদের নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন, কেউ কেউ অবিচারের শিকার হয়েছে। সেই জায়গায় স্বাধীন বিচারালয়ের আলাদা সচিবালয় হওয়ার কথা- এটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। তার মানে বিচারকে আর স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হবে না। আগের সেই ফ্যাসিবাদের কায়দায় এখন ডিক্টেশনের আন্ডারে বিচার চালানো হবে।

তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সেখানে একটা নিরপেক্ষ বডি এটা করবে সেই রকম অধ্যাদেশ জারি হলো সেটাকে ঠেকিয়ে দিলো। এখানেও দলীয় প্রভাব। দলীয় ভিত্তিতে যখন বিচারক তৈরি হবে তখন বিচারপতি খাইরুল হক তৈরি হবে, বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক তৈরি হবে। শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তৈরি হবে। ওটা দলীয় ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের কুফল। সে কুফল আপনারা ভোগ করলেন, আমরাও ভোগ করলাম। আবার কেন সেই পুরোনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাবো? পিএসসি গঠনে ঠিক একই কথা সেটাকে ঠেকিয়ে দেয়া হলো। এগুলো যখন বিদ্যমান থাকবে আমরা আশঙ্কা করছি অতীতের ফ্যাসিজমের চাইতে আগামীর ফ্যাসিজম হবে আরও ভয়াবহ। এজন্য আমরা বলতে বাধ্য হয়েছি। যেদিন গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হয়েছে সেদিন থেকে এই নতুন ফ্যাসিজমের যাত্রা শুরু হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান ছিলো, সবগুলো ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। খেলার ময়দানেও বাপের তালিকায় আবার কেউ স্বামীর তালিকায়- এভাবে দলীয়করণ করে ফেলা হলো। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো আসল দক্ষ সে লোকগুলোকে ওএসডি করা হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। আর জনগণের উপর জুলুম করা হচ্ছে। পুলিশেও একই অবস্থা। সকল দিকে একটা মহা নৈরাজ্য চলতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চোখের পলকে বিদায়। দুদক থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন, মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বিচারকদের উপর হস্তেক্ষেপ করে এখন ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে, অথচ বলা হচ্ছে বিচারকরা স্বাধীন। এ অল্প সময়ের ভিতরে তারা এ কাজগুলো করেছে।

চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং হেলথ কার্ডও দিবেন এটা ভালো, কিন্তু সে জায়গায়ও দলীয়করণ। আবার এটাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদাবাজি আগের চাইতে এখন দিন দিন বাড়তেছে।

দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে মানুষ পিষ্ঠ। দুই কারণে, একটা জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আরেকটি হলো- বাড়তি চাঁদার চাপ। এর সবটুকু খেটে খাওয়া মানুষের ঘাড়ে চাপতেছে। অথচ আপনারা বলেছিলেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি- মিডিয়া আর সমাজের বিভিন্ন জায়গার ভালো মানুষগুলোর ঠোট সেলাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে কারো ঠোট বা মুখ চিরদিন বন্ধ করা যায় না।

তিনি বলেন, আমরা ন্যায়সম্মত সকল কাজে সমর্থন এবং সহযোগিতা দিবো। অন্যায় এবং জনগণের অধিকার হরণ করার যত কাজ আছে সব কাজের বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াবো, ইনশাআল্লাহ। এ ক্ষেত্রে এক চুলও ছাড় দিবো না।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের লড়াই আমাদের জাতির জন্য, সবার জন্য। এ লড়াই আপনাদের-আমাদের সকলের। এ লড়াইয়ে আমরা একসাথে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আমরা দৃঢ় আস্থাশীল। জনগণের সব দাবি আদায় গণভোটের রায়ও বাস্তবায়ন হবে, ইনশাআল্লাহ। আইনি কোনো জটিলতায় এ পথে বাধা হয়ে থাকতে পারবে না। আইন মানুষের জন্য, সংবিধানও মানুষের জন্য। আইন এবং সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। এখন সংবিধানের কথা বললে সরকারি দলও নেই এবং বিরোধী দলও নেই। এটা কোন সংবিধানের বলে আসছে? এটা ন্যাশনাল কনসাসের বলে আসছে, বলেন তিনি।

সরকারি দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আসুন, ভুল মানুষ করে আমরাও করতে পারি। জাতি মনে করে আপনারা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত, ভুল থেকে বের হয়ে আসেন। প্রথমে গণভোটের রায়কে মেনে নিন। তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিন। আমরা আপনাদের বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবো। কিন্তু জনগণের উপর ফ্যাসিজম কায়েম করার জন্য সামান্য কিছু ময়লা- আবর্জনা যদি থাকে, সেটা আমরা মেনে নেবো না। এই সংসদের তিনশ’ মানুষ যদি দেশবাসীর জন্য দায়িত্বশীল হয়ে যায়- তাহলে বাংলাদেশ বদলে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতির সেই স্লোগান কে মানে, কে মানে না- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। আমরা কার্যত দেখতে পাচ্ছি- দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়! এই চরিত্রকে পাল্টাতে হবে। রাজনীতির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে আর চলতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, পানি সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, সার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এগুলো নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো আলোচনা করা উনাদের পছন্দ নয়, শুধু লুকোচুরি। আমাদের আহ্বান হলো আসুন খোলামনে আলোচনা করে জাতীয় সংকট উত্তরণে একসাথে কাজ করি। এ দেশটা আমাদের সকলের।

আমীরে জামায়াত বলেন, বগুড়া আর শেরপুর আরও দুই বিপদ ঘটে গেছে। এখন মানুষ বলে, ’৯৪ তে মাগুরা, ২৬’ সালে এসে বগুড়া। ফেয়ার ইলেকশন দিয়ে হয় আপনারা জিতবেন, না হয় আমরা জিতবো- কেন এমন করা হলো? আমরা সমসময় বলেছি, সাদাকে সাদা বলুন, কালোকে কালো বলুন। আমার সাদাকে সাদা বলুন। সাদাটাকে কালো এবং বাদামী বানাতে যাইয়েন না। এটা ভালো জিনিস নয়।

দেশবাসীর উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনাদের অধিকার কেউ ঘরে এনে দেবে না। হয়তো আপনারা বলবেন, আর কত ত্যাগ? হ্যাঁ, ত্যাগের রাস্তায় আমাদের চলতে হবে এবং কালো রাতের অবসান ঘটবে। কে বাঁচবো কে মরবো জানিনা। কোন দল ক্ষমতায় আসবে, কোন দল ক্ষমতা থেকে যাবে- তাও জানি না। কিন্তু এটা জানি, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি অবিচার করেন না। সুতরাং সুবিচার পাব, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, আমাদের অনুরোধ যারা মজলুম তাদের যেন কেউ আর কষ্ট না দেয়। যারা জুলুম করছেন, তারা বিশ্ববাসীকে মেহেরবানী করে আর কষ্ট দেবেন না। স্বাধীন দেশ হিসেবে সবাই সম্মানের সাথে পাশাপাশি বসবাস করার পরিবেশ নিশ্চিত করুন। জাতিসংঘকে বিশ্বসভার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।