পার্লামেন্টে সংবিধান সংস্কার করা না হলে সমস্ত সমস্যার সমাধান রাজপথেই হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে শুধুমাত্র সংশোধনের কথা বলা জাতির সঙ্গে প্রতারণার সামিল।
মঙ্গলবার (৪ জুলাই) রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক জাতীয় শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদ পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ নতুন বাংলাদেশের পথ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি বলেন, কনিষ্ঠ শহীদ জাবের ইব্রাহিম, আনাস ও মেহেদী হাসানদের মতো যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না; তাঁরা কেবল একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হওয়া আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সে সিদ্ধান্ত হয়। তাঁর দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এই গণরায়কে অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে চরম প্রতারণা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই ভোটে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় একটি মেনে অন্যটি না মানার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করা হলে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা আবারও রাজপথে নামবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের একটি বড় অংশই ছিলেন শ্রমিক। কিন্তু জীবন উৎসর্গকারী, আহত কিংবা অঙ্গহানি নিয়ে বেঁচে থাকা শ্রমিকরা আজও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে কোনোভাবেই রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের নম্রতাকে যেন কেউ ভুল করে দুর্বলতা মনে না করে। তিনি ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে পারেনি। সাড়ে বারো হাজার টাকা মজুরিতে একটি শ্রমিক পরিবার কোনোভাবেই চলতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমসংস্কারের কথা ভুলে সরকার শ্রমিকদের সামনে 'ফ্যামিলি কার্ডের মূলা' ঝুলিয়েছে, যা শ্রমিক-জনতা কখনো মেনে নেবে না। অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে রাজপথে নেমে আসার জন্য তিনি শ্রমিক সমাজের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ রিকশা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন, বাংলাদেশ কৃষি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কবির আহমদ, বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মাওলানা মুহিবুল্লাহ, বিআরইএলের সভাপতি আক্তারুজ্জামান, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নুরুল আমিন, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, কেন্দ্রীয় পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক জামিল মাহমুদ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এ এইচ এম আতিকুর রহমান এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক আবু রায়হানসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।