প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একের পর এক কার্ড সেবার উদ্বোধন করছেন। নির্বাচনের ইশতেহার এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একের পর এক কার্ডনির্ভর সেবার ঘোষণা সরকারের শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে প্রশংসা পাচ্ছে। এরমধ্যে সোমবার যশোরের সমাবেশে এলজিপি কার্ডের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এর সুবিধাসমূহের ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিএনপি সরকার দেশের নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আটটি বিশেষ কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতার মাধ্যমে সরাসরি জনগণের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
সরকারের মহাপরিকল্পনার অধীনে আটটি ভিন্ন ভিন্ন কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকদের নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে - ফ্যামিলি কার্ড, এলপিজি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, ক্রীড়া কার্ড,স্বাস্থ্য কার্ড, শ্রমিক কার্ড এবং ছাত্র/যুব কার্ড। এর বাইরে রয়েছে জ¦ালানি তেল সমস্যা মোকাবেলায় ফুয়েল কার্ড।
এর মধ্যে ফ্যামিলি বা পরিবার কার্ড পরিবারের নারী প্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হয়। প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনি কেনার সুবিধা পাওয়া যায়। এলপিজি কার্ড চালু করা হয়েছে রান্নার কষ্ট লাঘবে নারীদের জন্য। এর মাধ্যমে কার্ডধারীরা ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পাবেন। কৃষক কার্ড মূলত কৃষকদের কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহ প্রদান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দিতে এই কার্ডের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রীড়া কার্ডে খেলোয়াড়দের সহায়তা ও ক্রীড়া খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য কার্ড সম্পর্কে বলা হচ্ছে নাগরিকদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এই হেলথ কার্ড ব্যবহৃত হবে। শ্রমিক কার্ডে মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণ এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে এই কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্র/যুব কার্ড: শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষা সহায়তার জন্য এই কার্ডটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সামনে রেখে দলীয় নির্বাচনী প্রারচারণায় তিনি দলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দেন। এরমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ডে’র ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও জনমনে আগ্রহের জন্ম দেন তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার অনুযায়ী ক্ষমতাগ্রহণের পরপরই খুব দ্রুতই চালু করেন ফ্যামিলি কার্ড। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপির প্রধান সেবা কার্ড মূলত ৩টি। এর বাইরেও সরকারের প্রথম দুই মাসেই জনকল্যাণে আরো বেশ কয়েকটি সেবাকার্ড ইতোমধ্যেই চালু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি একে একে বেশ কয়েকটি সেবামূলক কার্ডের কাজ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছেন। এরমধ্যে রয়েছে-কৃষক কার্ড, ক্রীড়া কার্ড, ফ্রিল্যান্সার কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, এলপিজি কার্ড। এর বাইরে ইতোমধ্যে সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ফুয়েল কার্ড বা ফুয়েল পাস চালু করেছে।
প্রাথমিকভাবে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে 'ফ্যামিলি কার্ড' চালু করার ঘোষণা দিলেও সরকার প্রধান জানিয়েছেন, দেশের সব গৃহিনীরা পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পাবেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে-নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। পরিবারের গৃহিণী বা নারী সদস্যদের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
কৃষক কার্ড: পর্যায়ক্রমে সারা দেশের কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ দিচ্ছে সরকার। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে এই কার্ড। এর মাধ্যমে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। বাংলা নবর্ষের পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে টাঙ্গাইলে এ কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা প্রধানত ১০ ধরনের সেবা ও সুবিধা পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ: সার, উন্নত মানের বীজ এবং কীটনাশক সরাসরি সরকারী দামে কেনার সুযোগ। আর্থিক সহায়তা ও ঋণ: সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে কৃষিঋণ প্রাপ্তি। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির কৃষকদের বছরে একবার সরাসরি আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে। প্রাথমিকভাবে ১০ জেলায় এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২.৭৫ কোটি কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৩০ মার্চ জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া কার্ড’ ও বিশেষ ভাতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং খেলোয়াড়দের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। পারিবারিক নিরাপত্তা: “ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা”-এই স্লোগানকে সামনে রেখে খেলোয়াড়দের পরিবারকে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করাও কার্ডের অন্যতম সেবা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (ইঈই) আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ায় ক্রিকেটারদের আপাতত এই ভাতা কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে।
ই-হেলথ কার্ড: সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদীতে এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ই-হেলথ কার্ড হলো একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য একটি ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। ২০২৬ সালের জুন মাসের শেষ নাগাদ এই কার্ডটি সারাদেশে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে 'প্রবাসী কার্ড' (ঊীঢ়ধঃৎরধঃব ঈধৎফ) চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রবাসীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এলপিজি কার্ড: রান্নার জ্বালানি সংকট দূর করতে এবং গৃহিণীদের শারীরিক কষ্ট লাঘবে এই বিশেষ কার্ড ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২৬ এপ্রিল) যশোরে বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্বোধন ও জনসভায় এই ঘোষণা দেন তিনি। এই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে নিবন্ধিত নারী সদস্যরা বিশেষ ভর্তুকিতে বা সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে পারবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। গ্রামীণ নারী যারা ধোঁয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন এবং শহুরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার যাদের জন্য চড়া দামে গ্যাস কেনা কঠিন।
ফ্রিল্যান্সার কার্ড: বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের সরকারি স্বীকৃতিস্বরূপ ফ্রিল্যান্সার কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।
আগামী ৫ বছরে প্রায় ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যেই সাড়ে সাত হাজার ফ্রিল্যান্সার এই কার্ড পেয়েছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সরকারের এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
বিশেষ ফুয়েল কার্ড (ফুয়েল পাস): জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করার চেষ্টা চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। ইশতেহারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে 'সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগানকে সামনে রেখে 'করবো কাজ, গড়বো দেশ'-এই মূলনীতিতে ইশতেহারটি সাজানো হয়।
ইশতেহারে বিএনপি ৯টি মূল অঙ্গীকার এবং ৫১ দফার একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে। এরমধ্যে-রাষ্ট্রীয় সংস্কার: ইশতেহারে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সাংবিধানিক সংস্কার, এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি ইশতেহারে জনগণের কাছে বিএনপির দেয়া প্রধান প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারগুলো ছিল-'ফ্যামিলি কার্ড' চালু, কৃষক কার্ড চালু, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা। আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং 'মিড-ডে মিল' চালু করা হবে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।