পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার কোনো আন্তর্জাতিক বৈঠক না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আদতে একে-অপরের থেকে খুব একটা দূরে অবস্থান করছে না বলে দাবি করেছে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ সূত্রগুলো। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা, সিএনএন, এএফপি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার

ইরানের আছে: রাশিয়া

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভ-ামি’ ও ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ‘পুরো দায়ভার ইরানের ওপর চাপানোর একটি চেষ্টা চলছে, যেন মনে হয় ইরানই তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু যুদ্ধের সময় কোনো উপকূলীয় দেশ আক্রান্ত হলে নিরাপত্তার স্বার্থে তারা নিজ জলসীমায় জাহাজ চলাচল সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’

পশ্চিমা দেশগুলোকে জলদস্যুদের সঙ্গে তুলনা করে রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলায় সমর্থন দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আইন লঙ্ঘন করছে। নেবেনজিয়া আরও বলেন, ‘জলদস্যুরা যেমন জাহাজে কঙ্কাল আঁকা কালো পতাকা উড়িয়ে আক্রমণ করে, পশ্চিমা দেশগুলো তেমনটা করে না। তারা তাদের বেআইনি কর্মকা-কে একতরফা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার (নিষেধাজ্ঞা) আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব নেই

পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আদতে একে অপরের থেকে খুব একটা দূরে অবস্থান করছে না বলে দাবি করেছে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ সূত্রগুলো। বাহ্যিক অচলাবস্থা সত্ত্বেও পর্দার আড়ালে বর্তমানে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, দুই দেশ একটি পর্যায়ক্রমিক সমঝোতার পথে হাঁটছে, যেখানে সম্ভাব্য চুক্তির প্রথম ধাপে যুদ্ধের আগের স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কোনো ধরনের বাধা বা শুল্ক ছাড়াই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। তবে এই আলোচনার টেবিলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টি আপাতত তোলা হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, এই পরমাণু ইস্যুকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধের প্রধান কারণ বা ‘ক্যাসুস বেলি’ হিসেবে সামনে এনেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে ইরানকে অবশ্যই তাদের বোমা তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ত্যাগ করতে হবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ইরান এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর দাবি মেনে নিতে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। সূত্রগুলো বলছে, একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতাকারীরা বর্তমানে উভয়পক্ষের ওপরই প্রচ- চাপ সৃষ্টি করছেন। চলমান এই প্রক্রিয়ায় আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠতে পারে। কারণ পুরো পরিস্থিতির ওপর ছায়া ফেলছে যুদ্ধের কালো মেঘ; সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা থেকে সরে এসে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার পথ বেছে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ পরমাণু সম্মেলনের সহ সভাপতি নির্বাচিত

হওয়ায় ইরানের সঙ্গে বিত-ায় জড়াল যুক্তরাষ্ট্র

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা নিয়ে জাতিসংঘে বিত-ায় জড়াল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের এ নির্বাচনকে এনপিটি চুক্তির প্রতি ‘উপহাস’ বলে বর্ণনা করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান তাদের পারমাণবিক দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গেও পূর্ণ সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

ইরান বলেছে, পরমাণু চুক্তি মেনে চলার বিষয়ে মন্তব্য করার নৈতিক অধিকার বা গ্রহণযোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তারা যুক্তি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

‘যেকোনো পরিস্থিতিতে’ একে অপরের পাশে

থাকবে রাশিয়া ও ইরান : রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

রাশিয়া ও ইরান যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরকে সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ। ইরানের উপ–প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিকের সঙ্গে এক বৈঠকে আন্দ্রেই বেলোসভ এ কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ঘনিষ্ঠতা দিন দিন আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই চলমান সংকট ও সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ সমুদ্র আইন মানতে

বাধ্য নয় তেহরান: ইরান

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁর দেশ জাতিসংঘের সমুদ্র আইন মেনে চলতে ‘বাধ্য নয়’। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নেওয়া বিভিন্ন নৌ-পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন তিনি। ইরাভানি যুক্তি দেন, বর্তমান ‘অত্যন্ত অস্থিতিশীল’ পরিস্থিতিতে উপকূলীয় নিরাপত্তা ও নিরাপদ নৌ-চলাচলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই এ পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।

ইরানি প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’র অভিযোগ তুলে বলেন, তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ-অবরোধ এড়িয়ে যাচ্ছে। ইরাভানি আরও বলেন, ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের এ উদ্বেগ কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় এবং তাদের কর্মকা- ও অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়।’