একটু ভারী বৃষ্টি হলেই যেন থমকে যায় চট্টগ্রাম নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে সড়ক পরিণত হয় ছোটখাটো খালে। চলাচল বন্ধ হয়ে যায় যানবাহনের, ভোগান্তিতে পড়ে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীরা। গতকাল মঙ্গলবারের বৃষ্টিতেও একই চিত্র দেখা গেছে নগরের বিভিন্ন এলাকায়। প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথা, কাতালগঞ্জ, আমতল, এনায়েত বাজারসহ বহু এলাকায় সড়কে পানি জমে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে নগরের প্রবর্তক মোড় এলাকায়। সেখানে সড়কে বুকসমান পানি জমে অনেক যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন ব্যবসায়ীরা। রিকশা, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি মাঝপথে আটকে যায়। পথচারীদের অনেককে কাপড় গুটিয়ে পানি মাড়িয়ে চলতে দেখা গেছে। কেউ কেউ জুতা হাতে নিয়ে হাঁটছেন, আবার কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাতেও দেখা যায় একই চিত্র। অফিসপাড়া হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় পানি জমে যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ব্যাংক, বীমা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারেননি। হালিশহরের বিভিন্ন ব্লকেও রাস্তাঘাট ডুবে যায়। নিচু এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া গেছে।

নিউমার্কেট ও তিন পুলের মাথা এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নগরের কাতালগঞ্জ এলাকায় ড্রেন উপচে সড়কে পানি ওঠে। আমতলের তিন রাস্তার মাথা এলাকায়ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এনায়েত বাজার এলাকায় দোকানপাটের সামনে পানি জমে ক্রেতা সমাগম কমে যায়। অনেক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যদি নগরীর এই অবস্থা হয়, তাহলে ভারী বর্ষণে কী হবে-সেই আতঙ্ক এখন থেকেই কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, খাল-নালা পরিষ্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বছরের পর বছর কাজ চললেও বাস্তবে দুর্ভোগ কমেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে খাল দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পাহাড় কেটে মাটি খালে ফেলা। এছাড়া বৃষ্টির পানি দ্রুত কর্ণফুলী নদীতে নামতে না পারাও বড় কারণ। জোয়ারের সময় নদীর পানি উল্টো শহরের দিকে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেও বড় এলাকা প্লাবিত হয়।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংস্থা একাধিক প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো “চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন”শীর্ষক মেগা প্রকল্প।

এই প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, প্রশস্তকরণ, রেগুলেটর নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার, স্লুইস গেট স্থাপন এবং পানি নিষ্কাশনের পথ উন্নয়নের কথা ছিল। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা, পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটিতে। এছাড়া কর্ণফুলী তীর সংরক্ষণ, রেগুলেটর নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন এবং বারইপাড়া খাল খননসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

তবে প্রশ্ন উঠছে-এত টাকা খরচের পরও সুফল কোথায়? নগরবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেক স্থানে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। কোথাও খাল খননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কোথাও ড্রেন নির্মাণ হলেও সংযোগ ঠিকভাবে হয়নি। আবার কোথাও ভূমি অধিগ্রহণ জট, কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও সমন্বয়হীনতার কারণে কাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।

বিশেষ করে নগরের মরিয়ম বিবি খাল, কলাবাগিচা খাল, ফিরিঙ্গীবাজার খাল, চাক্তাই খাল ও রাজাখালী খালের বিভিন্ন অংশে এখনও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। অনেক এলাকায় স্লুইস গেট ও রেগুলেটর নির্মাণ হলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সিল্ট ট্র্যাপ না থাকায় পাহাড়ি মাটি আবার খালে জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, তার সঠিক বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। খাল দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নইলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রাম একটি পাহাড়-নদী-সমুদ্রবেষ্টিত জটিল ভূপ্রকৃতির শহর। এখানে জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এক সংস্থা খাল খনন করছে, আরেক সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করছে-কিন্তু পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবে সুফল মিলছে না। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় আটকে পড়া অফিসগামী মো. ইব্রাহীম বলেন, “প্রতি বছর শুনি হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই দেখি একই অবস্থা। তাহলে এই টাকা কোথায় যাচ্ছে?”

এই প্রশ্ন এখন শুধু একজনের নয়, পুরো নগরবাসীর। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই নগরের বাস্তব চিত্র মানুষকে হতাশ করছে। জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা যেন চট্টগ্রামবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পরও যদি নগরের মানুষকে বুকসমান পানি মাড়িয়ে চলতে হয়, তবে উন্নয়নের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখন নগরবাসীর একটাই দাবি-কাগজে নয়, বাস্তবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান দেখতে চান তারা।