স্টাফ রিপোর্টার
মেয়ের বিয়ের কাজে ঢাকায় এসে ইসমাইল হোসেনের (৫০) লাশ হয়ে ফেরার ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। বনানী এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রাজ ক্লাসিক নামের একটি বাসের চালকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ইসমাইলের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার সময়, তার কোমরে থাকা জমি বিক্রির টাকার বান্ডিল দেখে ফেলেন ওই বাসের সুপারভাইজার। এরপর চালকের সঙ্গে পরিকল্পনা করে হত্যাকা- ও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। গতকাল রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন। গ্রেফতার তিনজন হলেন- বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) ও বাসচালকের সহকারী মো. মনির হোসেন (১৯)।
পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, গত শুক্রবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে বনানী থানাধীন স্টেডিয়াম-সংলগ্ন এলাকায় এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের লাশ পড়ে থাকার সংবাদ পাওয়া যায়। পরে বনানী থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। তার মুখ এবং দুই হাতে স্কচটেপ পেঁচানো ছিল এবং গলায় কালো দাগ দেখা যায়। পরে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিহত ব্যক্তি ছিলেন ইসমাইল হোসেন। পরে পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে মৃতদেহের ছবি শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন জানিয়ে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বলেন, ভুক্তভোগী ইসমাইল জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিলেন। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, ঘটনার পর বনানী থানার পুলিশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। ফুটেজ পর্যালোচনার একপর্যায়ে একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে এটিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়। পরে জামালপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানোর পাশাপাশি ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের একটি বাস মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং চালকের সহকারী মনির হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে ফারুক হোসেন বলেন, গ্রেফতাররা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, শুক্রবার ভোর সাড় ৪টার দিকে জামালপুরের দিগপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে যাত্রী হিসেবে বাসে তোলা হয়। একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু তার কাছে ভাড়া চাইলে তিনি কোমরে লুঙ্গির ভাজ থেকে ভাড়া বের করে দেন। তখন বাকি টাকাগুলো দেখে ফেলেন সুপারভাইজার সাজু। সাজু পরে বাসচালককে জানান যে, ওই যাত্রীর কাছে অনেক টাকা আছে এবং সম্ভবত তিনি কোনো ব্যাপারি। এরপর ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্তরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে ইসমাইলকে নিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে। একপর্যায়ে সুপারভাইজার এবং চালকের সহকারী মিলে ইসমাইলের মুখ এবং হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। সেই সঙ্গে একটি গামছা পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করে অভিযুক্তরা বাসটি নিয়ে বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বনানীতে আসেন। এখান থেকে তারা ইউটার্ন করে আবার বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় ইসমাইলের লাশ সেখানে ফেলে যান। পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, ভুক্তভোগীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা থাকলেও অভিযুক্তরা জিজ্ঞাসাবাদে পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। তারা বলেছেন, আড়াই লাখ টাকার মতো তারা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী বাসে একমাত্র যাত্রী ছিলেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ইসমাইলকে আসামীরা ঘুমিয়ে যেতে বলেন। তাকে বলা হয়, নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে তাকে ঘুম থেকে ডেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। ইসমাইল ঘুমিয়ে গেলে বাসের অন্য যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে ভুক্তভোগী ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে তাকে নির্ধারিত স্থানে না নামিয়ে হত্যা করা হয়।