জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। জেলার আটটি উপজেলায় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মোট ১ হাজার ৩০৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৬৯১টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬১৫টি পদ খালি। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় চলতি দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সর্বশেষ উপজেলা ভিত্তিক শূন্যপদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যশোর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ২৮৯টি। বিধি অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির থাকায় সংকট দিন দিন তীব্রতা ধারণ করছে।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে মণিরামপুর উপজেলায়। সেখানে ২৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৮টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক । যশোর সদরে ২৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৬টি, শার্শায় ১২৫টির মধ্যে ৮২টি, চৌগাছায় ১৩৯টির মধ্যে ৭৬টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টির মধ্যে ৭২টি, অভয়নগরে ১১৭টির মধ্যে ৭০টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টির মধ্যে ৬১টি এবং কেশবপুরে ১৩৮টির মধ্যে ৩৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের সংকটও উদ্বেগজনক। প্রাক-প্রাথমিকসহ সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত মোট পদ ৭ হাজার ৯১১টি হলেও বর্তমানে ৬১৫টি পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে মণিরামপুরে ১৫৪টি, যশোর সদরে ১০৭টি, কেশবপুরে ৭৪টি, শার্শায় ৭২টি, অভয়নগরে ৫৬টি, বাঘারপাড়ায় ৫৫টি, চৌগাছায় ৫৪টি এবং ঝিকরগাছায় ৪৩টি সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করছে। ফলে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান চালিয়ে যেতে গিয়ে তারা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে।

এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মণিরামপুর উপজেলার এক সহকারী শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় অফিসের সব প্রশাসনিক দায়িত্ব আমাদেরই সামলাতে হয়ে। একই সাথে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন। দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি না হলে শিক্ষার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে নয়ে।

সদর উপজেলা শিক্ষা কমিটির সদস্য মাস্টার আনিসুর রহমান বলেন, যশোর সদর উপজেলার ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১১৪টিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। বাকি ১৩৬টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে প্রায় ৮৫টি বিদ্যালয় সম্পূর্ণভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, আর প্রায় ৫০টিতে চলতি দায়িত্বে দায়িত্ব পালন করছেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। দীর্ঘদিন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড.মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকই শিক্ষা ও প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি। বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা এবং সহকারী শিক্ষকের ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা দাপ্তরিক কাজ সামলাতেই ব্যস্ত থাকেন। ফলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করা না হলে জেলার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে) জানান, দীর্ঘদিন ধরে মামলাজনিত জটিলতা এবং নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় এ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা সম্ভব।