টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা : টেকনাফ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ লবণ মাঠজুড়ে এখন আর সাদা সোনার ঝলক নেই, আছে শুধু হতাশা, দুশ্চিন্তা আর লোকসানের দীর্ঘশ্বাস। চলতি মৌসুমে একদিকে বাজারে লবণের অস্বাভাবিক কম দাম, অন্যদিকে মৌসুমের মাঝপথে বারবার আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড় লবণচাষিদের জীবন-জীবিকাকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
মাঠে উৎপাদিত প্রতি মণ লবণের পেছনে যেখানে একজন চাষির খরচ পড়ছে প্রায় ৪০০ টাকা, সেখানে বাজারে সেই লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২৭০ টাকায়। ফলে প্রতি মণেই গুনতে হচ্ছে অন্তত ১৩০ টাকা লোকসান। বছরের পর বছর ধরে লবণ চাষ করে পরিবার চালানো হাজারো চাষা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে টেকনাফ উপজেলার বিস্তীর্ণ লবণ মাঠে যারা ধারদেনা করে, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা জমি বন্ধক রেখে চাষে নেমেছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন পথে বসার উপক্রম। চাষিরা বলছেন, এবারের মৌসুমের শুরুতেই নানা প্রতিকূলতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এরপর যখন কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, তখনই শুরু হয় ঘনঘন কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি। গত প্রায় ১৫ দিন ধরে অনেক এলাকায় লবণ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। মাঠে জমে থাকা আধাপাকা লবণ বৃষ্টির পানিতে গলে নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে পুরো মাঠ প্লাবিত হয়েছে। এতে শুধু উৎপাদিত লবণ নয়, পরবর্তী উৎপাদনের প্রস্তুতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টেকনাফের বিভিন্ন লবণ মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মাঠে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। শ্রমিকেরা বসে আছেন কাজহীন অবস্থায়। মাঠের পাশে স্তূপ করে রাখা লবণের বড় অংশ বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক চাষি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, কারণ ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এলেও বিক্রি করার মতো পর্যাপ্ত লবণ তাদের হাতে নেই।
স্থানীয় একাধিক চাষি জানান, চলতি মৌসুমে তারা আশা করেছিলেন আগের বছরের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু বাজারদর কমে যাওয়া এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সেই আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, “লবণ চাষ করে এবার লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও উঠছে না। এনজিওর কিস্তি, শ্রমিকের বেতন, জমির লিজ,সব মিলিয়ে আমরা এখন দিশেহারা।” অনেকেই জানিয়েছেন, পরিবারের খরচ চালাতে গবাদিপশু বিক্রি করতে হচ্ছে, কেউ কেউ আবার নতুন করে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবছেন পুরোনো ঋণ শোধ করার জন্য। এতে ঋণের বোঝা আরও বাড়ছে।
স্থানীয় বাজার সংশ্লিষ্ট লবণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত আমদানিকৃত লবণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেও দেশীয় লবণচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা মনে করছেন, সরকার যদি সময়মতো বাজার নিয়ন্ত্রণ ও চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিত, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
তাঁরা আরো বলেন,লবণচাষিদের সরকারিভাবে প্রতি মণ লবণের একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে অন্তত উৎপাদন খরচ উঠে আসে এবং চাষিরা কিছুটা লাভ করতে পারেন। পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সুদ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে টেকনাফের অধিকাংশ লবণচাষি চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে দেশের চাহিদা পূরণে লবণ উৎপাদন করলেও এখন তাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এভাবে লোকসান চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে অসংখ্য চাষি লবণ উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়াবেন। এতে ভবিষ্যতে দেশে লবণের ঘাটতি তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
লবণচাষিদের ভাষায়, “আমরা দেশের জন্য লবণ উৎপাদন করি, কিন্তু নিজেদের ঘরে এখন অভাব। যদি সরকার দ্রুত বাজারে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব।” এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না আসায় নতুন করে উৎপাদন শুরু নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মাঠে জমে থাকা পানি শুকাতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। ফলে মৌসুমের বাকি সময়েও কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
উপকূলের এই জনপদে এখন লবণের মাঠজুড়ে সাদা স্বপ্নের বদলে জমে উঠেছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ; আর সেই মেঘের ভারে নুয়ে পড়েছেন হাজারো লবণচাষি পরিবার। টেকনাফের লবণ চাষিরা এই অবস্থা থেকে দ্রুত উদ্ধারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। টেকনাফের বিসিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।