ইতিহাস ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক জেলা কুষ্টিয়া। বর্তমান বৃহত্তর কুষ্টিয়া স্বাধীনতা উত্তর ১৯টি জেলার মধ্যে ছিল ১৮ তম। ৪৭’ উত্তর দেশ বিভাগের পর মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চল হিসাবে এটি পূর্ব বাংলার অন্তভুক্ত হয়। বিভাগপূর্ব সময়ে এটি ছিল অবিভক্ত নদীয়া জেলার অংশ। তৎকালীন সময়ে নদীয়া জেলা মহকুমা ছিল ৫টি।
এগুলো হলো কৃঞ্চনগর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও রানাঘাট। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কুষ্টিয়া, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা নিয়ে স্বাধীন দেশ “কুষ্টিয়া জেলা” গঠিত হয়। প্রথম পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে এ জেলার নামকরণ করা হয় ‘নদীয়া’। আর ভারত ভূখন্ডের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া অংশকে বলা হয় নবদ্বীপ। পরবর্তীতে প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং চিঠিপত্রের আদান প্রদানে জটিলতা দেখা দেয়। ফলে এ নদীয়া জেলাকে করা হয় কুষ্টিয়া জেলা। তাই কুষ্টিয়ার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। কুষ্টিয়া প্রথম মহকুমা হয় ১৮৬০ সালে।
১৭২৫ সালে কুষ্টিয়া নাটোর জমিদারীর অধীনে ছিল এবং এর পরিচিতি আসে কান্ডানগর পরগণার রাজশাহী ফৌজদারীর সিভিল প্রশাসনের অন্তর্ভূক্তিতে। পরে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৭৬ সালে কুষ্টিয়াকে যশোর জেলার অন্তর্ভূক্ত করে। কিন্তু ১৮২৮ সালে এটি পাবনা জেলার অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৮৬১ সালে নীল বিদ্রোহের কারণে কুষ্টিয়া মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৮৭১ সালে কুমারখালী ও খোকসা থানা নিয়ে কুষ্টিয়া মহকুমা নদীয়ার অর্ন্তগত হয়। ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির পূর্বে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার আওতায় একটি মহকুমা ছিল। ১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া জেলার অভ্যুদয় ঘটে। তখন কুষ্টিয়া জেলা ৩ টি মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল। এগুলো কুষ্টিয়া , চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর। এরপর ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর আলাদা জেলা হিসেবে পৃথক হয়ে গেলে কুষ্টিয়া মহকুমার ৭ টি থানা নিয়ে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ
কুষ্টিয়ার নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী। কুষ্টিয়ায় এক সময় কোষ্টার (পাট) চাষ হত বলে কোষ্টা শব্দ থেকে কুষ্টিয়া নামকরণ হয়েছে। হেমিলটনের গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে যে স্থানীয় জনগণ একে কুষ্টি বলে ডাকত বলে এর নাম হয়েছে কুষ্টিয়া। অনেকের মতে ফরাসি শব্দ’’ কুশতহ’’ যার অর্থ ছাই দ্বীপ থেকে কুষ্টিয়ার নামকরণ হয়েছে। সম্রাট শাহজাহানের সময় কুষ্টি বন্দরকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরের উৎপত্তি ঘটেছে।
প্রাচীন জনপদ হিসাবে কুষ্টিয়া নামকরনের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, কুষ্টে শব্দ থেকে কুষ্টিয়া শব্দটি এসেছে। কুষ্টিয়া নামকরনের ব্যাপারে বেশ কিছু যুক্তিও আছে। এ জেলার এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ এখনও কুষ্টিয়াকে “কুষ্টে” বলে অভিহিত করে। অনেকের মতে কুষ্টা থেকে কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে “কুষ্টা” জন্মায় বলে এ নামের সৃষ্টি হতে পারে।
সৈয়দ মুর্তাজা আলীর মতে, কুষ্টিয়া শব্দটি ফার্সি কুশতহ বা কুস্তা থেকে এসেছে। অনেকের মতে, কুস্তি খেলাকে কেন্দ্র করে কুস্তি বা কুষ্টি এবং সব শেষে কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে।
ইতিহাসবিদরা গবেষকরা বলেছেন, কাষ্টিয়া শব্দ থেকে এসেছে কুষ্টিয়া। কাষ্টিয়া শব্দটি চুরুণি ভাষা। কাষ্টিয়া অর্থ ওলি, আউলিয়াদের ঘুমানোর জায়গা। এ জেলায় ওলি আউলিয়া,পীর বুজুর্গ বসবাস করার কারণে কাষ্টিয়া থেকে কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ করা হয়েছে।
সম্রাট শাহজাহানের আমলে এ স্থানটি গড়ে উঠেছিল নৌবন্দর হিসাবে। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী নদীবন্দর হিসাবে খ্যাত ছিল। এ জন্য প্রাচীন সভ্যতার অনেক নিদর্শন রয়েছে কুমারখালীতে।
সীমানা : কুষ্টিয়া জেলার উত্তর পশ্চিম এবং উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা, পশ্চিমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং পূর্বে রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। ভারতের সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে।
গুণীজনদের তীর্থভূমি : “আমার শেষ জীবন কাটাতে চাই কুষ্টিয়ায়” বাংলাদেশের হৃদয় হতে। কথাটি বলেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়। এমন কথা শুধু তারই নয় অনেক কবি সাহিত্যিক, লেখক ও মনীষীর। প্রাচীন জনপদ কুষ্টিয়ার মাটি ও মানুষকে ঘিরে নানান কথা গল্প লিখেছেন তারা। প্রাচীন ঐতিহ্য পদ্মা গড়াই বিধৌত কুষ্টিয়ার বিস্তৃর্ণ জনপদ। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মরমী কবি বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, সু-সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন, কাঙ্গাল হরিণাথ, জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, কবি আজিজুর রহমান, নীলকর আন্দোলনের পথিকৃত জমিদার প্যারী সুন্দরী, অবিভক্ত ভারতের প্রধান বিচারপতি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং হিরোসীমায় পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ডঃ রাধা বিনোদ পাল, বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক কবি দাঁদ আলীসহ অসংখ্য খ্যাতিমান, কবি সাহিত্যিক, বরেণ্য ব্যক্তি ও মনীষীর স্মৃতি বিজড়িত সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম পাদপীঠ কুষ্টিয়া জেলা।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্যাগ,তিতীক্ষা ও সেবার কারণে এ জেলার অনেক মাটি ও মানুষ অত্যান্ত গর্বিত। বিপ্লবী বাঘা যতীন, সরোজ আচার্য, অতুল কৃষ্ণ, সুনীল সেনগুপ্ত, জ্যেতিষ চন্দ্র এবং অন্তহরি প্রমুখ স্বদেশী বিপ্লবীরা দেশ ও মাতৃকার নিঃস্বার্থ সেবার কারণে স্মরণীয়র ও বরণীয় হয়ে আছে। স্বদেশী আন্দোলনের পাশাপাশি ওহাবী আন্দোলনের কাজী মিয়াজান, খেলাফত আন্দোলনে আফসার উদ্দিন আহমেদ, কৃষক প্রজা আন্দোলনে শামসুদ্দিন আহমেদ, খেলাফত আন্দোলনে প্রফেসর আব্দুস সাত্তার পথিকৃত পুরুষ।
১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যূত্থান, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় আন্দোলনে কুষ্টিয়াবাসীর ভুমিকা অগ্রগণ্য। মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভুমিকার কারণে বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় সামগ্রীক ইতিহাসে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। বৃহত্তর কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিব নগরে মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাজধানী প্রতিষ্ঠায় এ জেলাকে গৌরবের আসনে সমাসীন করেছে।
অসংখ্য কবি সাহিত্যিক, শিল্পী, কুশলী এবং চিত্রকরের অনন্য অবদানের কারণে সারা দেশের মধ্যে কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে খ্যাতি পেয়েছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত এই কুষ্টিয়া শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে করেছে সমৃদ্ধ। এছাড়াও বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন এবং বাউল সম্রাট লালনের তীর্থভূমি, পুরাতন কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর গ্রামে গীতিকার, সুরকার ও কবি আজিজুর রহমানের বাস্তভিটা ও কবর, এ জনপদে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট কবি দাদ আলী, লেখিকা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, ‘‘এই পদ্মা এই মেঘনা’’ গানের রচয়িতা আবু জাফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা কাঙাল হরিণাথ, নীল বিদ্রোহের নেত্রী প্যারী সুন্দরী, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা বাঘা যতিন, ‘‘এই পদ্মা এই মেঘনা’’ গানের রচয়িতা আবু জাফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী, সঙ্গীত শিল্পী মোঃ আব্দুল জববার, ফরিদা পারভীনসহ অসংখ্য গুণীজনের তীর্থস্থান কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ করেছে।
ভৌগলিক অবস্থা
সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলার উত্তর পশ্চিম এবং উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা, পশ্চিমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং পূর্বে রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। ভারতের সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে।
২৩,২৯০-২৪, ১৩০ উত্তর অক্ষাংশ, এবং ৮৮,৩৪০-৮৯.২২০ পুর্ব দ্রাঘিমাংশ।
দর্শনীয় স্থান
শিলাইদহ কুঠিবাড়ী, ফকির লালন শাহের মাজার, মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তু ভিটা ইত্যাদি।
এক নজরে কুষ্টিয়া জেলা
আয়তন : ১৬২১.১৫ বর্গ কিঃ মিঃ লোকসংখ্যা: ২১.৪৯.৬৯২ জন তন্মধ্যে – পুরুষ- ১০,৫৫.৮৭৫ জন, মহিলা-১০,৯৩,৭২৪ জন।
নির্বাচনী এলাকা : ৪ টি, কুষ্টিয়া-সদর-৩ দৌলতপুর-১, মিরপুর ভেড়ামারা-২, খোকসা কুমারখালী-৪।
মোট ভোটার সংখ্যা : ১৬,৪৩,৯১২। পুরুষ ভোটার : ৮,২২,৫১৬ জন। মহিলা ভোটার : ৮,২১,৩৮৮ জন
উপজেলা : ৬ টি। থানা :৭ টি। পৌরসভা: ৫টি :- কুষ্টিয়া, কুমারখালী, খোকসা, ভেড়ামারা, মিরপুর। ইউনিয়ন : ৬৬ টি। গ্রাম : ৯৭৮ টি। নদী : ১১ টি। প্রধান নদী: পদ্মা, গড়াই, হিসনা, ডাকুয়া, সাগরখালী, চন্দনা, কালীগঙ্গা ।
হাটবাজার : ৩১০ টি। কুষ্টিয়া জেলার মোট জমি: ১.৬৮.২২৮ হেক্টর। তন্মধ্যে ক, আবাদী জমি – ১.১৭.৬৫৪ হেক্টর, [খ] সেচকৃত ৪৮.৭২৫ হেক্টর। ইউনিয়ন ভূমি অফিস :৬৩ টি
সড়ক ও জনপথ
পাকা রাস্তা – ২২৯.৮ কিঃ মিঃ, আধাপাকা রাস্তা – ১৬৬.৫০ কিঃ মিঃ, কাঁচা রাস্তা – ২২০৫.৮ কিঃ মিঃ, রেল পথ – ৯০ কিঃ মিঃ আবাসন :১৩ টি আশ্রয়ণ প্রকল্প :৭ টি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান : ১৭৭ টি, রাইস মিল ৪০০ টি ।
কুষ্টিয়া ৬ উপজেলার ৬৬ ইউনিয়নসমুহ
সদর উপজেলা- ১৩ ইউনিয়ন : হরিনারায়নপুর, উজানগ্রাম, আলামপুর, মনোহরদিয়া, আব্দালপুর, ঝাউদিয়া, বটতৈল, আইলচারা, গোস্বামী দুর্গাপুর, পাটিকাবাড়ি, হাটশ হরিপুর, বারখাদা, জিয়ারখী।
দৌলতপুর উপজেলা-১৪ ইউনিয়ন: রামকৃষ্ণপুর, প্রাগপুর, মথুরাপুর, চিলমারী, বোয়ালিয়া, আদাবাড়িয়া, খলিশাকুন্ডি, আড়িয়া, ফিলিপ নগর, দৌলতপুর, হোগলবাড়ীয়া, পিয়ারপুর, মরিচা, রিফাইতপুর।
ভেড়ামারা উপজেলায়-৬ ইউনিয়ন : বাহাদুরপুর, বাহিরচর, মোকারিমপুর, ধরমপুর, জুনিয়াদহ, চাদগ্রাম, ভেড়ামারা পৌরসভা।
মিরপুর উপজেলা-১২ ইউনিয়ন: চিথলিয়া, বহলবাড়িয়া, তালবাড়িয়া, বারুইপাড়া, আমলা, সদরপুর ছাতিয়ান, পোড়াদহ, কুর্ষা, মালিদহ, আমবাড়ীয়া, মিরপুর পৌরসভা, ফুল বাড়ীয়া।
কুমারখালী উপজেলা-১১ ইউনিয়ন : যদুবয়রা, পান্টি, চাদপুর, বাগুলাট, সাদকি, জগন্নাথপুর, কয়া, নন্দিলালপুর, শিলাইদহ, চাপড়া, কুমারখালী পৌরসভা।
খোকসা উপজেলা-১০ ইউনিয়ন : খোকসা, সমসপুর, জানিপুর, আমবাড়ী, গোপালগঞ্জ, জয়ন্তহাজরা, ওসমানপুর, বেতবাড়ীয়া, শিমুলিয়া, খোকসা পৌরসভা।